সাবেক এআইজি নরসিংদীর তৎকালীন ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ এস পি শেখ রফিকুল ইসলামকে পাবনায় বদলি
নরসিংদীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) শেখ রফিকুল ইসলামকে পাবনায় বদলির আদেশ দেওয়ার ফলে পাবনাবাসীর মাঝে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ, উৎকন্ঠা। গত ১ আগষ্ট বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবিরের স্থলে বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তরে সম্প্রতি এআইজির দায়িত্ব পালন করা শেখ রফিকুল ইসলামের পাবনায় বদলির কারণে, পাবনার সুশীল সমাজসহ অনেকেই মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। এক তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ রফিকুল ইসলামের মতো নৈতিকতা বিবর্জিত পুলিশের এহেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পাবনায় বদলি করার ফলে ইতোমধ্যেই পাবনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে জেলার থানাগুলোতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি অনুযোগ করেন, ‘শেখ রফিকুল ইসলামের মতো একজন অঘটন ঘটনপটিয়সী, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে পাবনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া যেনো পাবনাবাসীর সাথে উপহাসেরই নামান্তর। তার মতো একজন অনৈতিক কর্মকান্ডের হোতার অতীত ইতিহাস বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হবার কিংবা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রচারিত হবার ফলে অন্যান্য সকল জেলার মতো পাবনাবাসীও ইতোমধ্যে অবগত রয়েছে। তারা আরোও জানায়, পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের পাবনায় বদলি হবার পরপরই জেলার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, বিভিন্ন মামলার দাগী আসামী, চোর, টাউট-বাটপার, মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারী, জুয়াড়ী, ইভ টিজার,চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, অপহরণকারীসহ নানাবিধ সামাজিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তি যারা সদ্য বিদায়ী সফল পুলিশ সুপার জিহাদুল কবিরের ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলো, তারা এখন সময়-সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ বুঝে, নরসিংদীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (নরসিংদী জেলাকে যিনি করে তুলেছিলেন সন্ত্রাস, দুর্নীতির অভয়ারণ্য ) শেখ রফিকুল ইসলামকে নিজেদের স্বপক্ষের লোক ভেবে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে আসছে। এতে করে জেলাজুড়ে নিরীহ মানুষের মাঝে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। সন্ধ্যা হলেই এখন ঘরের দরজা লাগিয়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছে অসহায় জনসাধারণ।’ এক নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, নরসিংদীর মতো পাবনাকেও নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নির্বিঘেœ মাদকের বিভিন্ন স্পট থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায়ের জন্য বিশ^স্ত লাইনম্যান/কালেকশন বয়ের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তুলতে নানামুখী তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে চরম আত্ম-অহমিকাপূর্ণ পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম ।
পাবনার নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে , গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নরসিংদী জেলা পুলিশ রেশন ষ্টোরের জন্য উন্নতমানের ছোট দানা বিশিষ্ট ক্যাঙ্গারু মশুরের ডাল ক্রয়/সংগ্রহ সংক্রান্ত একটি উন্মুক্ত দরপত্র আহŸান করা হয়, যার স্মারক নং- ৪৯০২/ই, তারিখ ০৬/০৯/২০১৪। দরপত্রের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ),নরসিংদী মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদকে সভাপতি করে, তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি খোলা কমিটি (ঞঙঈ) গঠন করা হয়। এতে অংশগ্রহন করে ক. মেসার্স মাইশা এন্টারপ্রাইজ খ. মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজ গ. মেসার্স মারিশা এন্টারপ্রাইজ এবং ঘ. মেসার্স রায় ট্রেডার্স। প্রতিটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহন করে পৃথক পৃথক দরপত্র প্রকাশ করে। মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজ ১২০ টাকা/কেজি, মেসার্স মারিয়া এন্টারপ্রাইজ ১১৮ টাকা/কেজি, মেসার্স রায় ট্রেডার্স ১১৮.৫০ টাকা/কেজি এবং মেসার্স মাইশা এন্টারপ্রাইজ ১১৭.৫০ টাকা/কেজি দর উল্লেখ করে। দরপত্রের নিয়মানুযায়ী সর্বনি¤œ দরদাতা মেসার্স মাইশা এন্টারপ্রাইজের টেন্ডারে উল্লেখিত কাজটি পাওয়ার কথা থাকলেও,দুর্নীতিবাজ এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের স্বজনপ্রীতি,দুর্নীতি ও মোটা অংকের টাকা ঘুষের বিনিময়ে বেআইনিভাবে নামসর্বস্ব,কথিত কোম্পানি লামিয়া এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেয় বলে জানা গেছে। দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী মানসম্পন্ন ডাল সরবরাহ না করে, মেসার্স চিত্তরঞ্জন ট্রেডার্স থেকে নামে মাত্র মূল্যে, খাওয়ার অনুপোযোগী বড় দানার ডাল ক্রয় করে তা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পুলিশ সদস্য ছাড়াও, অন্যান্যের মাঝে রেশন হিসেবে সরবরাহ করে। শেখ রফিকুল ইসলামের পুকুর চুরির এ ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে পুলিশ সদস্যদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে প্রদান করেন। এছাড়াও কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার মতো বেরিয়ে আসে, শেখ রফিকুল ইসলাম শরীয়তপুর জেলা থেকে ২০১৪ সালের ৫ মে নরসিংদীতে যোগদান করার পর জেলায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ বৃদ্ধি পায় বিভিন্ন অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ। ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর জেলার বেলাব উপজেলার বারৈচা জামে মসজিদের ইমামকে জোরপূর্বক ধরে আনার সময় বাধা দেওয়ায়, তৎকালীন এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের নির্দেশে মুসুল্লীদের উপর পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। বহুল সমালোচিত সে ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত এবং চারজন আহত হবার কারণে, জেলাসহ সমগ্র বাংলাদেশে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। সাবেক এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মরজাল,নীলকুটি,মাহমুদাবাদ ও মনোহরদী উপজেলার মাষ্টারবাড়িতে যাত্রা পালার নামে জুয়া ও নগ্ন নৃত্যের আয়োজকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ গ্রহনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তার এহেন ন্যাক্কারজনক ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে, সংবাদমাধ্যম এবং সংবাদকর্মীদেরকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার করতে থাকে। পরবর্তীতে জনরোষের সৃষ্টি হলে এবং নরসিংদীতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটলে তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। সেখান থেকে গত ২৮ জুন ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে শেখ রফিকুল ইসলামকে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত বদলির এক সরকারী আদেশে, পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত এআইজি (রিক্রুটমেন্ট এন্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-১) দপ্তরে পদায়ন করা হয়, অবিলম্বে উক্ত আদেশ কার্যকর করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধ কালোটাকার বিনিময়ে সে তা বাস্তবায়ন না করার ধৃষ্টতা দেখায়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী কতিপয় পুলিশ সদস্য জানায়, শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ করার পরও তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহন না করার কারণে সে আরোও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অবৈধ পথে অর্জিত তার কালো টাকার কাছে প্রশাসনের কতিপয় অর্থলোভী, নীতি বিবর্জিত, স্খলিত চরিত্রের কমকর্তাদের কারণেই অন্যান্য সৎ ও ন্যায়পরায়ণ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি,ক্ষমতার অপব্যবহার,গনমাধ্যম কর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান, তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবসহ নানাবিধ অপকর্মের খরব প্রকাশিত হবার পরও তার চাকুরিতে বহাল তবিয়তে থাকার সুযোগে দাম্ভিকতা প্রদর্শণ করে, অধস্তন পুলিশ সদস্যসহ সকলের সাথেই অশোভন আচড়ন করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। নরসিংদীর তৎকালীন এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের অপকর্মের খবর জনসম্মুখে প্রকাশ হবার পরও তার নির্লজ্জ ও বেপরোয়া আচড়ন করার কারণে পুলিশের অনেক সৎ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যই নিজেদেরকে পুলিশ পরিচয় দিতে বিব্রত বোধ করেন বলেও জানায় কেউ কেউ, অথচ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল সোনালী ইতিহাস। শেখ রফিকুল ইসলামের এভাবে নির্বিঘেœ একের পর এক অনৈতিক কর্মকান্ড করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে খোদ পুলিশ বাহিনীতেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ভুক্তভোগী পুলিশ সদসরা। সর্বশেষ গত ১ আগষ্ট বুধবার প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে শেখ রফিকুল ইসলামকে পাবনায় বদলির আদেশ দেয়া হলে, পাবনার বিশিষ্টজন ছাড়াও সমাজের সর্বস্তরের মানুষ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। মোড়ের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ, হাট-বাজার, গ্রাম-গঞ্জের সর্বত্রই পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের অপকর্ম নিয়ে মুখরোচক সমালোচনা চলছে প্রতিনিয়ত। ‘দুষ্টের দমন আর শিষ্টের লালন’ নীতিতে বিশ^াসী পাবনাবাসী শেখ রফিকুল ইসলামকে পাবনা থেকে অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করার জন্য এবং একজন সৎ, নির্ভীক , নিষ্ঠাবান পুলিশ সুপারকে পাবনায় দায়িত্ব দেয়ার মধ্য দিয়ে, পাবনাবাসীর জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট আকুল আবেদন জানিয়েছে।
