চলে গেলেন কিংবদন্তি অন্নপূর্ণা দেবী।
মাত্র কদিন আগে গেলো ৭ অক্টোবর খুব ধুমধাম করে কলকাতায় পালন করা হলো ৯১ তম জন্ম দিন। আমিও ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেব ভেবেছিলাম আগে থেকেই কিন্তু বোনের অসুস্থতায় তা আর হয়েওঠেনি। ইচ্ছে অপূর্ণই থেকে গেলো তাঁকে দেখার। অবশেষে চলেই গেলেন সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সুযোগ্য মেয়ে পণ্ডিত রবিশংকরের সাবেক জীবনসঙ্গী রাগসংগীতের কিংবদন্তি রওশন আরা অন্নপূর্ণা দেবী।
৯১তম জন্মদিনের পর সপ্তাহ পার না হতেই চলে গেলেন পরপারে। আজ ১৩ অক্টোব শনিবার ভারতের সময় ভোর ৩টা ৫১ মিনিটে বোম্বের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে পরলোক গমন করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯১ বৎসর।
''ঐতিহ্য কুমিল্লা''র পক্ষ থেকে আমরা গভীর শোক জ্ঞাপন করছি।
অন্নপূর্ণা দেবী। আসল নাম রওশন আরা বেগম। একজন স্বনামধন্য সুরবাহার শিল্পী এবং উত্তর ভারতীয় সনাতনী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গুরু। তিনি ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকপাল ওস্তাদ আলাউদ্দীন খার কন্যা এবং পন্ডিত রবি শঙ্করের স্ত্রী। রওশন আরা বেগমের জন্ম: ১৯২৭ সালের ৭ অক্টোবর। অন্নপূর্ণা দেবী চৈতি পূর্ণিমা তিথিতে মধ্য প্রদেশের মাইহারে জন্ম গ্রহণ করেন ।
তার পিতার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে রওশন তার পিতার যোগ্য কন্যা হয়ে ওঠেন এবং ভারতীয় কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী হয়ে ওঠেন। তিনি মুম্বাইতে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত শিক্ষা দিয়েছেন অনেক দিন। তার শিশ্যদের মধ্যে হরিপ্রসাদ চৌরসিয়া, নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, আমিত ভট্টাচার্য, প্রদীপ বারতসহ অনেকে সুপ্রতিষ্ঠিত।
ব্যক্তিগত জীবনঃ
তার পিতা ওস্তাদ আলাউদ্দীন খান হিন্দুস্তানি ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা এবং ভাই আলী আকবর খান ভারতের কিংবদন্তি সরোদ শিল্পী।
অন্নপূর্ণা তার বাবার ছাত্র বিখ্যাত সেতার শিল্পী রবি শঙ্করকে ১৯৪১ সালে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় অন্নপূর্ণার বয়স ছিল ১৪ এবং রবিশঙ্করের বয়স ছিল ২১। তাদের একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয় যার নাম শুভেন্দ্র শঙ্কর বা শুভ যাকে অন্নপূর্ণা সেতার বাজানো শেখান। শুভ অল্প বয়সেই মারা যান এবং তার তিন সন্তান রয়েছে।
উত্তর আমেরিকা বঙ্গ সম্মেলন স্মরণিকা ২০১৪-তে প্রকাশিত এক লিখায় অন্নপূর্ণর ছাত্রর লিখা থেকে জানা যায়, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দিকপাল মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা আলাউদ্দীন খানের কন্যা ও খ্যাতনামা সরোদবাদক আলী আকবর খানের ভগ্নী অন্নপূর্ণা। পিতার কাছে দীক্ষিত অন্নপূর্ণা দেবী নিজেও ছিলেন স্বনামধন্য সুরবাহার শিল্পী। তাঁদের একমাত্র পুত্রসন্তান শুভেন্দ্র (শুভ) শঙ্করের সেতার বাজানোর হাতেখড়ি হয় অন্নপূর্ণাদেবীর কাছে।
১৯৬২ সালে রবিশঙ্করের সঙ্গে তাঁর বিবাহ-বিচ্ছেদ হয়। বিচ্ছেদ ঘটার আগে থেকেই বাইরের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা উনি ছেড়ে দিয়েছিলেন। তবে সঙ্গীতের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিন্ন হয় নি। মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডিতে তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে সঙ্গীত শিক্ষার সুযোগ পাওয়াটা ছিল পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার।
নিজের বিবাহ-বিচ্ছেদ নিয়ে অন্নপূর্ণাদেবী বরাবরই নীরব ছিলেন। ২০০০ সালে কয়েকটি লিখিত প্রশ্নের উত্তরে এ ব্যাপারে কিছুটা আলোকপাত করেছিলেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্নপূর্ণাদেবী বলেন, “পঞ্চাশ দশকে আমরা যখন একসঙ্গে বাজাতাম, তখন শ্রোতা এবং সমালোচকদের কাছ থেকে আমার বেশী প্রশংসা পাওয়াটা পন্ডিতজীর (রবিশঙ্কর) ভালো লাগত না। সেটার একটা বিরূপ প্রভাব আমাদের বিয়ের ওপরে পড়ত। যদিও উনি (রবিশঙ্কর) সরাসরি আমাকে অনুষ্ঠানে গিয়ে বাজাতে বারণ করে নি, কিন্তু তাঁর নানান আচরণের মধ্যে স্পষ্ট ভাবে প্রকাশ পেত - আমি যে এই বেশী হাততালি পাচ্ছি, তাতে উনি বিরক্ত বোধ করছেন।”
সুখী বিবাহিত জীবন, না শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ? অন্নপূর্ণা প্রথমটিই বেছেছিলেন। “স্বভাবে আমি অন্তর্মুখী, সংসারই আমার কাছে বড়। তাই যশ বা খ্যাতির বদলে বিয়েটাকেই রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।”
অন্নপূর্ণাদেবীর এই আত্মত্যাগ সত্ত্বেও তাঁদের বিয়েটা ভেঙ্গে যায়। রবিশঙ্করের জীবনে তখন অন্য নারী এসে গেছেন।
বিচ্ছেদ ঘটে যাবার পরেও অন্নপূর্ণা দেবী কেন বাইরের সঙ্গীতজগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন - এর উত্তর অজ্ঞাত। মনে হয় উনি সঙ্গীতসাধনায় যতটা বিশ্বাসী ছিলেন, পরিবেশনায় ততটা নয়। আড়ালে থাকার দরুণ তাঁর সম্পর্কে একটা ঔৎসুক্য ও আগ্রহ অনেকেরই রয়েছে, কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই যে খ্যাতি তাঁর প্রাপ্য ছিল, সেটা উনি পান নি।
তবে তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা অনেকে করেছেন। অন্নপূর্ণা দেবী সম্পর্কে উস্তাদ আমীর খান নাকি বলেছিলেন, “উস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর ৮০ শতাংশ পেয়েছেন অন্নপূর্ণা, ৭০ শতাংশ আলী আকবর আর ৪০ শতাংশ রবিশঙ্কর!"
আলী আকবর খাঁ নিজেও নাকি সেটা অস্বীকার করেন নি; এক সময়ে বলেছিলেন, “একদিকে আমাকে, রবিশঙ্করকে আর পান্নালালকে (ঘোষ) বসাও, অন্য দিকে অন্নপূর্ণাকে। পাল্লায় অন্নপূর্ণাই ভারি হবে।” হয়ত বোনের সম্পর্কে সেটা ছিল দাদার সস্নেহ উক্তি।
পন্ডিত রবিশঙ্কর ও প্রথমা স্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবীর বিচ্ছেদ এক ট্র্যাজেডী।
রবিশঙ্করের প্রথম পত্নী অন্নপূর্ণা দেবী ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসের কিংবদন্তি। নিভৃতচারী এই শিল্পীই একবার স্বেচ্ছায় ডেকেছিলেন আলিফ সুর্তিকে, দিয়েছিলেন দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। সে সাক্ষাৎকারের ওপর ভিত্তি করে ম্যানজ ওয়ার্ল্ড-এ, আগস্ট ২০০০-একটি লেখা প্রকাশ হয়।
সেখানে উল্লেখ ছিলো, এক বটবৃক্ষের ছায়াতলে অন্নপূর্ণার সংগীত-প্রতিভা লালিত হয়েছে। সেই মহিরুহ ছিলেন তাঁর বাবা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। অন্নপূর্ণা অবশ্য প্রতিভার আলো ছড়াতে পেরেছিলেন নিজের গুণেই। পরে সেতারের অসামান্য প্রতিভা পণ্ডিত রবিশঙ্করকে বিয়ে করে তিনি সুরের বাঁধনে আরও ভালোভাবে জড়িয়ে পড়েন। এ বাঁধন অবশ্য টেকসই হয়নি।
বেদনাদায়ক ব্যাপার হলো, সে বিচ্ছেদের সূত্র ধরেই সংগীতের ভুবন থেকে হারিয়ে গেছে তাঁর সুর। রবিশঙ্করের সঙ্গে বিরোধের ফলেই অন্নপূর্ণা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন জীবনে আর কখনোই দর্শকদের সামনে সেতার বা সুরবাহার বাজাবেন না। প্রতিজ্ঞায় অনড় থেকে তিনি বেছে নেন মুম্বাইয়ের বাসগৃহে নিভৃত নিঃসঙ্গ জীবন। তাঁর জীবনে আর কোনো দিন রেকর্ডিং করেননি, ৬০ বছরেরও বেশি সময় তিনি বাইরের আলোয় নিজেকে তুলে ধরেননি।
সম্মাননাঃ
অন্নপূর্ণা ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মভূষণ লাভ করেন ১৯৭৭ সালে।
ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের ছোট ভাই ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ'র নাতি অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী সরোদ শিল্পী তানিম হায়াত খান রাজিত জানাজ, অন্নপূর্ণা দেবীর হিন্দু মতে বিয়ে হয়েছিল। তবে, আলদা করে হিন্দু হননি। কিন্তু বলে গিয়েছেন দাহ করতে। তাই তাঁকে দাহ করা হবে। পরে ছাই মাইহারে মাটি দেয়া হবে দাদুর (আলাউদ্দিন খা) কবরের পাশে। সেখানে একটা মনুমেন্ট করা হবে দাদুর কবরের পাশে।
