ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
আপডেট : ১৬ অক্টোবর, ২০১৮ ১৬:২৯

রাজধানীর কড়াইল বস্তির গ্যাস, পানি , বিদ্যুৎ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের মহাগুরু ডেকোরেটর শামসু ও ভাংগারী মন্জুল

পুরো বস্তি জুড়েই চলছে বিভিন্ন অপকর্ম
ক্রাইম রিপোর্টার
রাজধানীর কড়াইল বস্তির গ্যাস, পানি , বিদ্যুৎ  ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটের মহাগুরু ডেকোরেটর শামসু ও ভাংগারী মন্জুল
রাজধানীর বনানী এলাকার কড়াইল বস্তিতে দীর্ঘ দিন যাবৎ অবৈধভাবে জাতীয় সম্পদ গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের অপব্যবহার হয়ে আসছে বলে বসবাসকারীদের সূত্রে জানা যায় । আর এসব  জাতীয় সম্পদ অপব্যবহার কারীদের  নিয়ন্ত্রণ করছেন একটি সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম দুই মহাগুরু হচ্ছে শামসু ও ভাংগারী মন্জুল। ডেকোরেটর শামসুর কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সে বলে, ‘থানা প্রশাসনের সবাই আমার ব্যাপারটি জানে আমি সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলি । বিদ্যুতের আকতার ও বর্তমান সাবস্টেশন ইঞ্জিনিয়ার এবং গ্যাসের জহির , মোতালেব,নুর ইসলাম, হুমায়ূন সবার সাথেই আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। প্রতি মাসে জহিরকে দেই ১০,০০০/ দশ হাজার টাকা, যার ফলে আমার গ্যাস সংযোগের উপর কোন সমস্যা হয় না। সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় ৩৫০-৪০০ টি ঘরে সরাসরি জাতীয় গ্রিড লাইন থেকে অবৈধভাবে চোরাইকৃত বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ সরবরাহ করা হয়েছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দল  কুড়িল অফিসের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন কারী টিম ম্যানেজার সিরাজের মোবাইল নং (০১৯৩৯৯২১০৪০) এ গত ১৯/৯/২০১৮ইং তারিখ বিষয়টি অবহিত করলে, তিনি এই প্রতিবেদক দলকে এমডি অথবা জনসংযোগ কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করতে বলেন। তারা বিষয়টি দেখবেন, তার নাকি কিছুই করার নেই। গত ৭-১০-২০১৮ইং কড়াইলের অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে গুলশান বিদ্যুৎ অফিসে গেলে সাবস্টেশন ইঞ্জিনিয়ার আজাদের সাথে আলাপ করতে চাইলে সে তার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে নিয়ে যান, সেখানেও সে সঠিক উত্তর না দিয়ে সাব ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার মাসুম গণির মোবাইল নাম্বার ধরিয়ে দেন। তার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন। পরবর্তীতে তার মোবাইল নাম্বার (০১৭৫৫৬৩৭৫১৩) এ যোগাযোগ করে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য নির্বাহী প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন মিয়ার সাথে যোগাযোগ করতে বলেন ।
 
 
অপর দিকে কোন দিক থেকে পিছিয়ে নেই কড়াইল বস্তির স্বঘোষিত মহারাজা, ইয়াবা সম্রাট মন্জুল হক ওরফে (মঞ্জুল)। ইয়াবা ব্যবসায় সে পুরোদমে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত মাদকমুক্ত দেশ গড়ার অংশ হিসেবে প্রশাসনের মাদক বিরোধী বিশেষ অভিযান চলাকালীন সময়ে মনজিল হক পালিয়ে থাকলেও, অভিযান শেষ হওয়ার পর ফের প্রকাশ্য এসেছে। তবে সে এবার তার লেবাসের কিছুটা পরিবর্তন করে প্রকাশ্যে এসেছে। যা নিয়ে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক চমক সৃষ্টি হয়েছে। কখনো প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে আবার কখনো প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে কব্জা করে কড়াইল বস্তিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রমরমা ইয়াবা ব্যবসা করে যুবসমাজকে ধ্বংস দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দলের নিবিড় অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মনজুলের একাধিক অপরাধ কর্মকান্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য। কিভাবে প্রশাসনের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজোশে সে তার অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে সে জানায়,‘আমি পুলিশকে টাকা দিয়ে কাজ করি।’ অনুসন্ধানে জানা গেছে, কড়াইল বস্তির স্বঘোষিত মহারাজা মন্জুল হকের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ১৪ টি অবৈধ গ্যাস লাইনের সংযোগ। সরেজমিনে তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, গুলশান মহাখালী সড়কের চেকপোস্ট নার্সারীর  গা ঘেষে দুই ইঞ্চি মোটা গ্যাসের পাইপ থেকে লেকের মধ্য দিয়ে অসংখ্য প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে কড়াইল বস্তিতে সংযোগ সরবরাহ করা হয়েছে, যা সবকটির নিয়ন্ত্রণকর্তা মন্জুল ওরফে মনজু। এছাড়াও টি এন্ড টি ৫ নং গেটের সামনে ময়লার ডাস্টবিনের সাথে আরো ৫টি অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে তার নামে। বেশ কিছু দিন আগে একটি অভিযোগের ভিত্তিতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নকারী একটি টিম, অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গেলেও, ঐ দিন গভীর রাতে তিতাস গ্যাস অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত কওে, গ্যাস মিস্ত্রী জামিরের মাধ্যমে পুনরায় সংযোগ সচল রাখে।  মন্জুল ভাংগারী ব্যবসা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করে ৫শ টাকা রোজগার করতে তার সময় লাগতো তিন দিন। তবে যে আলাদিনের প্রদীপের জোরে কোটিপতি হয়েছে তার মধ্যে মাদক ব্যবসা অন্যতম বলে জানা গেছে। ইয়াবা ব্যবস্যায় রাতারাতি কোটিপতি হয়ে ইয়াবা ব্যবসার সাথে আরো কিছু অবৈধ ব্যবসা দিয়ে সে নিয়ন্ত্রন করছে কড়াইল বস্তিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল। এক সময়ে খুচরা ফেন্সিডিল ব্যবসায়ী মনজিল এখন ইয়াবার ডিলার। আর এই ইয়াবা ব্যবসায় সে গড়ে তুলেছে এক বিশাল সিন্ডিকেট। যাদের মাধ্যমে সে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করে। ইয়াবার ডিলার মন্জুলের সাথে সিন্ডিকেট করে কড়াইল বস্তির এক এক এলাকা এক একজন মাদক সম্রাট নিয়ন্ত্রণ করে। তবে মন্জুল সব সময়ই ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। কারণ, সে মোটা অংকের টাকায় বিভিন্ন সেক্টরকে ম্যানেজ করেই ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করে। প্রশাসনের চাপ বেড়ে গেলে মন্জুল হক তাবলীগ জামাতে চলে যায় বলে স্থানীয় এলাকাবাসী জানায়। সুত্র জানায়, কাসেম ওরফে বাবা কাসেম কড়াইলের ইয়াবা ব্যবসায় মন্জুলের অন্যতম সহযোগি। কাসেমের নিয়ন্ত্রনে বউবাজার বস্তির মধ্যে ইয়াবা ব্যবসা করে হারুন মিয়া, তার শ্যালক গুড্ডু ও সজীব। কাসেমের ঘনিষ্ঠ পার্টনার মোস্তফা। এরা দুজনে মন্জুলের টাকায় টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান বনানীতে নিয়ে আসে। রাস্তায় কোন ঝামেলা হলে মন্জুলই তা নগদ টাকার বিনিময়ে সমাধান করে। অথবা কেউ গ্রেপ্তার হলে টাকা খরচ করে মন্জুলই তাকে জামিনে বের করে আনে। এতে মন্জুলের প্রতি তার সিন্ডিকেটের লোকজনের বিশ্বাস অনেক বেড়ে যায়। মাছ বাজারের ওসমানের ছেলে আফাজ ও আশেক, ঝিলপাড়ের চিরতার ছেলে ইব্রাহিম, সাইদুল ইসলাম, ক বøকের জসিম ও তার বোন পারভীন ও বউবাজার খামারবাড়ির শাহীন, রফিক, বাদল ও নরুল ইসলামসহ আরো কয়েকজন মোস্তফার নিয়ন্ত্রনে খুচরা বিক্রেতা। এরা সবাই মোস্তফার নিটক থেকে পাইকারীতে ইয়াবা ক্রয় করে খুচরা বিক্রয় করে। এদিকে স্যাটেলাইট বস্তি এলাকার ঢাকা মহানগরের নেতাদের নাম ভাঙ্গীয়ে স্থানীয় শ্রমিক লীগের নেত্রী তাছলি ওরফে সুন্দরী তাছলি। মাদক ব্যবসা করে সে মন্জুলের চাইতে এক ধাপ উপরে। এ কারণে মন্জুলের সাথে তার সুসম্পর্ক। তাছলির রয়েছে কিছুটা রাজনৈতিক ক্ষমতা। যার বলে সেও বেশীর ভাগ সময়ই থাকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। প্রশাসনের সাথে রয়েছে তার দহরম মহরম সম্পর্ক। যার কারনে কোন মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসন কখন কি ব্যবস্থা নিচ্ছে তার আগাম খবর সে পেয়ে যায় খুবই দ্রæত। এ কারণে মন্জুলের ব্যবসায় কোন অসুবিধা হয় না। তাছলির এক বিশ্বস্ত সহযোগি জোছনাকে প্রায় দুই বছর আগে কড়াইলের টি এন্ড টি বস্তি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল কড়াইল মাদক প্রতিরোধ কমিটি। এসময় তাছলির শেল্টারে মনজিল থাকে অনেকটাই নিরব। জোছনা বর্তমানে নাখালপাড়ায় থাকলেও থেমে নেই তার মাদক ব্যবসা। টাকা ও ইয়াবা দুটো দিয়ে জোছনাকে সহযোগিতা করে মন্জুল আর বখরা পায় তাছলি। তাছলির সতিন হাছিনা পারভীন ও তার স্বামী মোস্তফার নিয়ন্ত্রণে কড়াইলে অন্তত ২৫ জন খুচরা ইয়াবা বিক্রেতাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মনজিলের মতো অসংখ্য পাইকার ব্যবসায়ী রয়েছে। এ ছাড়া জামাইবাজারের আবদুল খালেকের ছেলে জসিম, জিল্লু, রাসেল ওরফে ফরমা রাসেল, সীমা ও মোশারফ বাজারের শহিদুল ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিলসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসা করছে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ করছে। প্রধানমন্ত্রীর  মাদক বিরোধী অভিযান ঘোষণার পর থেকেই সারাদেশে র‌্যাব-পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিশেষ অভিযান শুরু করে। মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে র‌্যাব-পুলিশের ‘বন্দুযুদ্ধে’ নিহতের বহু ঘটনাও ঘটছে। বর্তমানে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান লক্ষ্য মাদক নির্মূল করা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা বাহিনীর কর্তারা বলেছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রশাসনের এমন কড়াকড়ি নজরদারির পরেও মনজিল হক সিন্ডিকেটের সদস্যরা ফের মাদক ব্যবসায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এই নিয়ে স্থানীয় জনসাধারনের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। আবার না জানি এসমস্ত সমাজ ধ্বংসকারী কড়াইল বস্তির মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণকারী ব্যক্তিদের ভয়াল মাদকের  গ্রাসে তাদের আদরের সন্তানটি না যেন আবার জড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনের প্রতি তাদের দাবী খুব দ্রæত মনজিল সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা। তা না হলে ধ্বংস হয়ে যাবে দেশের চালিকা শক্তি যুব সমাজ।
উপরে