মানারাতে পড়ার সময় চার জঙ্গির পরিচয় ঘটেছিল’
নরসিংদীর মাধবদীতে দুদিন ধরে ঘিরে রাখা জঙ্গি আস্তানা নিলুফা ভিলা থেকে ২ নারী জঙ্গি আত্মসমর্পণ করেছেন। টানা ৪০ ঘণ্টা পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চেষ্টায় জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করল। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
আটক দুই নারী জঙ্গি পরিচয় পাওয়া গেছে। একজনের নাম খাদিজা আখতার মেঘনা ও অন্যজনের নাম মৌ। তাদের বয়স ত্রিশের কোটায়। এর মধ্যে একজনের বিয়ে হয়েছিল। তার স্বামী নব্য জেএমপির একজন শীর্ষ নেতা। তাকে গ্রেফতারে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে। অন্যজনেরও বিয়ের প্রস্তুতি চলছিল। তারা বেসরকারি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ছিলেন।
জঙ্গিদের পরিচয় বিষয়ে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ‘আটক দুই নারী মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ছিলেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পড়ার সময়ই তাদের পরিচয় ঘটে।’
সিটিটিসি প্রধান জানান, গতকালের অভিযানে নিহত দুজন স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। প্রাথমিকভাবে তাদের নাম জানা গেছে, আবু আব্দুল্লাহ আল বাঙাল ও আকলিমা আখতার মনি। নিহত মনির সঙ্গে মেঘনা ও মৌরও সম্পর্ক ছিল।
তিনি জানান, নরসিংদী জেলা পুলিশের অধীনে রেখে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। আটক দুই নারীর কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। তবে তাদের কাছ থেকে বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে। বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল এসব বোমা নিস্তেজ করে দিয়েছে।
হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট এই তিন নারীসহ চারজন র্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন জানিয়ে সিটিটিসি প্রধান বলেন, ‘মানারাতে পড়ার সময়ই তাদের পরিচয় ঘটেছিল। তবে কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তাদের একজন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছেন। মিরপুর মডেল থানার একটি মামলায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল।’
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, নিলুফা ভিলায় আগে থেকেই জঙ্গিদের আনাগোনা ছিল। ভগীরথপুরের অভিযানে নিহতরাও এ বাড়িটিতে আসতেন।
নিগোশিয়েশনের মাধ্যমে এভাবে আত্মসমর্পণ করানোর ঘটনা সত্যিই বিরল উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিলুফা ভিলার অবকাঠামো দুর্বল ছিল। তাই এ অভিযান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
দুপুরে অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে এলাকাবাসীর এখন আর আতঙ্কের কোনো কারণ নেই বলে জানা তিনি।
এর আগে বুধবার (১৭ অক্টোবর) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট প্রধান মনিরুল ইসলাম বেলা সাড়ে ১১টায় সাংবাদিকদের বলেন, ‘গাংপারের আস্তানায় (নিলুফা ভিলা) ধারণা করা হচ্ছে অন্তত দুজন বা ততোদিক জঙ্গি থাকতে পারে। আমরা তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু ভেতর থেকে তাদের কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের গতিবিধি দেখে মনে হচ্ছে তাদের কাছে ‘এক্সক্লুসিভ’ কিছু থাকতে পারে। সর্বশেষ আত্মসমর্পণ না করলে আমরা অ্যাকশনে যাব।’
তার বক্তব্যের পরই ১১টা ৫০ মিনিটে একটি বিকট আওয়াজ শোনা গেছে। শব্দটি সাউন্ড গ্রেনেটের বলে ধারণা করা হয়। বিকট শব্দের পর ১১টা ৫৫ মিনিটে জঙ্গি আস্তানার দিকে যায় সোয়াটের আরেকটি দল। এর আগে সকাল সাড়ে ৯টায় সোয়াটের ১১ সদস্যের একটি দল আস্তানায় যায়।
আজকের অভিযান নিয়ে বুধবার (১৭ অক্টোবর) সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল যেখানে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেখানকার মতো এখানেও জঙ্গিদেরও আত্মসমর্পণ করানোর চেষ্টা করেছি। দফায় দফায় তাদের নিগোশিয়েশনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে।
যেহেতু তাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ নেই, সেহেতু তাদের লঘু শাস্তির আশ্বাস দেয়া হয়েছে। নানাভাবে অভয় দেয়া হলেও তারা সংলাপে আসছে না বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, নিগোশিয়েশনে দক্ষ এমন একটি টিম ঢাকা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে, যাতে জঙ্গিদের সংলাপে নিয়ে আসা যায়। কারণ আমরা একটি রক্তপাতহীন অভিযান চালাতে চাই। যখন কোন উপায়ন্তুর থাকবে না, তখনই কেবল অভিযান শুরু হবে।
জঙ্গিদের ধরতে বুধবার (১৭ অক্টোবর) সকাল থেকে ভবনটির ৫০০ গজের মধ্যে ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। ইতোমধ্যে স্থানীয় আফজাল হোসেনের মালিকানাধীন বাড়িটির গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করার পাশাপাশি মহল্লার কাউকে বাড়ির বাইরে বের না হতে এবং বাড়ির দরজা জানালা বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফলে ওই বাড়ির ৫০০ গজের ভিতরের বাসিন্দারদের অনেকে বাড়ি ফিরতে না পেরে আশপাশের মার্কেট ও মসজিদে অবস্থান করছেন। পুরো এলাকার মানুষ উৎকন্ঠার মধ্যে সময় কাটাচ্ছে।
