ঢাকা, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬
আপডেট : ১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ২৩:৫৬
একের পর এক সাংবাদিকের উপর হামলা হত্যার ঘটনা ঘটলেও নির্বিকার

পাবনার নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম

রাশেদুল হক
পাবনার নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম

নরসিংদীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) শেখ রফিকুল ইসলামকে গত  ১ আগষ্ট বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে, পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবিরের স্থলে বদলির আদেশ প্রদানের পর, পাবনায় জাতির বিবেকরূপী সাংবাদিক হত্যাকান্ডের মতো সারাদেশব্যাপী নিন্দনীয়, বহুল আলোচিত ঘটনায়, সমগ্র দেশের সাংবাদিকবৃন্দসহ পাবনার সুশীল সমাজ এবং সমাজের সর্বস্তরের সচেতন জনগন ফুঁসে উঠলেও, পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের রহস্যজনক নিরবতায় জেলার সর্বত্র চাপা গুঞ্জন উঠেছে বলে জানা গেছে।
এক তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ রফিকুল ইসলামের মতো নৈতিকতা বিবর্জিত পুলিশের এহেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে পাবনায় বদলি করার ফলে ইতোমধ্যেই পাবনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে। যার প্রভাব পড়েছে জেলার থানাগুলোতে। বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আনন্দ টিভির পাবনা প্রতিনিধি সুবর্ণা নদীকে (৩২) কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যার মাত্র ৪৫ দিন পর পাবনা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি, বৈশাখী টেলিভিশন ও দৈনিক সংবাদের পাবনা জেলাস্থ নিজস্ব প্রতিবেদক, হাবিবুর রহমান স্বপনের (৬৫)  প্রাণনাশের জন্য তার উপর ন্যাক্কারজনক হামলার মধ্য দিয়ে দৃশ্যত, সাংবদিকদের জন্য পাবনা জেলা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দেখা দিয়েছে। দুষ্কৃতিকারীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার শৈথিল্যে প্রতিনিয়ত এহেন হামলা কিংবা হত্যাকান্ড সংঘটিত করার সাহস দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। বর্তমানে নিজ কর্মস্থল এমনকি নিজ বাসগৃহ পর্যন্ত নিরাপদ মনে করছেন না পাবনার সাংবাদিকবৃন্দ। সুবর্ণা নদীর হত্যাকান্ড প্রসংঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কতিপয় স্থানীয় জানায়, যদিও নদীর হত্যার সাথে জড়িত সন্দেহে তার পূর্বের স্বামী-শ্বশুড়বাড়ীর লোকজনের নাম উঠে আসছে, কিন্তু যদি সাংবাদিক নদীর জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকা প্রকাশকে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বের সাথে দেখতো, তবে তার মতো একজন মেধাবী সাংবাদিককে এভাবে নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হতে হতোনা। সুবর্ণা নদীর হত্যাকান্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেক সাংবাদিকের উপর হামলার ঘটনায়, তারা আতঙ্কে দিন পার করছেন বলেও জানায় সে। তার কথা শেষ না হতেই নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি অনুযোগ করেন, ‘শেখ রফিকুল ইসলামের মতো একজন অঘটন ঘটনপটিয়সী, দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে পাবনায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেয়া যেনো পাবনাবাসীর সাথে উপহাসেরই নামান্তর। তার মতো একজন অনৈতিক কর্মকান্ডের হোতার অতীত ইতিহাস বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হবার কিংবা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক  মাধ্যমে প্রচারিত হবার ফলে অন্যান্য সকল জেলার মতো পাবনাবাসীও ইতোমধ্যে অবগত রয়েছে। তারা আরোও জানায়, পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের পাবনায় বদলি হবার পরপরই জেলার চিহ্নিত সন্ত্রাসী, বিভিন্ন মামলার দাগী আসামী, চোর, টাউট-বাটপার, মাদক ব্যবসায়ী, মাদক সেবনকারী, জুয়াড়ী, ইভ টিজার,চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, অপহরণকারীসহ নানাবিধ সামাজিক অপরাধে জড়িত ব্যক্তি যারা সদ্য বিদায়ী সফল পুলিশ সুপার জিহাদুল কবিরের ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিলো, তারা এখন সময়-সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ বুঝে, নরসিংদীর তৎকালীন পুলিশ সুপার (নরসিংদী জেলাকে যিনি করে তুলেছিলেন সন্ত্রাস, দুর্নীতির অভয়ারণ্য ) শেখ রফিকুল ইসলামকে নিজেদের স্বপক্ষের লোক ভেবে নিজ নিজ এলাকায় ফিরে আসছে। এতে করে জেলাজুড়ে নিরীহ মানুষের মাঝে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। 
পাবনার নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে , গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে নরসিংদী জেলা পুলিশ রেশন ষ্টোরের জন্য উন্নতমানের ছোট দানা বিশিষ্ট ক্যাঙ্গারু মশুরের ডাল ক্রয়/সংগ্রহ সংক্রান্ত একটি উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়, যার স্মারক নং- ৪৯০২/ই, তারিখ ০৬/০৯/২০১৪। দরপত্রের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ),নরসিংদী মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদকে সভাপতি করে, তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি খোলা কমিটি (টিওসি) গঠন করা হয়। এতে অংশগ্রহন করে ক. মেসার্স মাইশা এন্টারপ্রাইজ খ. মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজ গ. মেসার্স মারিশা এন্টারপ্রাইজ এবং ঘ. মেসার্স রায় ট্রেডার্স। প্রতিটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহন করে পৃথক পৃথক দরপত্র প্রকাশ করে। মেসার্স লামিয়া এন্টারপ্রাইজ ১২০ টাকা/কেজি, মেসার্স মারিয়া এন্টারপ্রাইজ ১১৮ টাকা/কেজি, মেসার্স রায় ট্রেডার্স ১১৮.৫০ টাকা/কেজি এবং মেসার্স মাইশা এন্টারপ্রাইজ ১১৭.৫০ টাকা/কেজি দর উল্লেখ করে। দরপত্রের নিয়মানুযায়ী সর্বনিম্ন দরদাতা মেসার্স মাইশা এন্টারপ্রাইজের টেন্ডারে উল্লেখিত কাজটি পাওয়ার কথা থাকলেও,দুর্নীতিবাজ এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের স্বজনপ্রীতি,দুর্নীতি ও মোটা অংকের টাকা ঘুষের বিনিময়ে বেআইনিভাবে নামসর্বস্ব,কথিত কোম্পানি লামিয়া এন্টারপ্রাইজকে পাইয়ে দেয় বলে জানা গেছে। দরপত্রের চুক্তি অনুযায়ী মানসম্পন্ন ডাল সরবরাহ না করে, মেসার্স চিত্তরঞ্জন ট্রেডার্স থেকে নামে মাত্র মূল্যে, খাওয়ার অনুপোযোগী বড় দানার ডাল ক্রয় করে তা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পুলিশ সদস্য ছাড়াও, অন্যান্যের মাঝে রেশন হিসেবে সরবরাহ করে। শেখ রফিকুল ইসলামের পুকুর চুরির এ ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে পুলিশ সদস্যদের প্রত্যেককে ৫০০ টাকা করে প্রদান করেন। এছাড়াও কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার মতো বেরিয়ে আসে, শেখ রফিকুল ইসলাম শরীয়তপুর জেলা থেকে ২০১৪ সালের ৫ মে নরসিংদীতে যোগদান করার পর জেলায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতিসহ বৃদ্ধি পায় বিভিন্ন অনৈতিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ। ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর জেলার বেলাব উপজেলার বারৈচা জামে মসজিদের ইমামকে জোরপূর্বক ধরে আনার সময় বাধা দেওয়ায়, তৎকালীন এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের নির্দেশে মুসুল্লীদের উপর পুলিশ অতর্কিত গুলিবর্ষণ করে। বহুল সমালোচিত সে ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত এবং চারজন আহত হবার কারণে, জেলাসহ সমগ্র বাংলাদেশে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়। সাবেক এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মরজাল,নীলকুটি,মাহমুদাবাদ ও মনোহরদী উপজেলার মাষ্টারবাড়িতে যাত্রা পালার নামে জুয়া ও নগ্ন নৃত্যের আয়োজকদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা ঘুষ গ্রহনের অভিযোগ পাওয়া যায়। তার এহেন ন্যাক্কারজনক ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে, সংবাদমাধ্যম এবং সংবাদকর্মীদেরকে প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে ক্রমাগত বিষোদগার করতে থাকে। পরবর্তীতে জনরোষের সৃষ্টি হলে এবং নরসিংদীতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটলে তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। সেখান থেকে গত ২৮ জুন ২০১৮ খ্রিঃ তারিখে শেখ রফিকুল ইসলামকে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারী স্বাক্ষরিত বদলির এক সরকারী আদেশে, পুনরাদেশ না দেয়া পর্যন্ত এআইজি (রিক্রুটমেন্ট এন্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-১) দপ্তরে পদায়ন করা হয়, অবিলম্বে উক্ত আদেশ কার্যকর করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে, অবৈধ কালোটাকার বিনিময়ে সে তা বাস্তবায়ন না করার ধৃষ্টতা দেখায়। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী কতিপয় পুলিশ সদস্য জানায়, শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিতভাবে অভিযোগ করার পরও তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহন না করার কারণে সে আরোও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অবৈধ পথে অর্জিত তার কালো টাকার কাছে প্রশাসনের কতিপয় অর্থলোভী, নীতি বিবর্জিত, স্খলিত চরিত্রের কমকর্তাদের কারণেই অন্যান্য সৎ ও ন্যায়পরায়ণ কর্মকর্তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। শেখ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি,ক্ষমতার অপব্যবহার,গনমাধ্যম কর্মীদের প্রাণনাশের হুমকি প্রদান, তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য কোটি টাকা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাবসহ নানাবিধ অপকর্মের খরব প্রকাশিত হবার পরও তার চাকুরিতে বহাল তবিয়তে থাকার সুযোগে দাম্ভিকতা প্রদর্শণ করে, অধস্তন পুলিশ সদস্যসহ সকলের সাথেই অশোভন আচড়ন করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। নরসিংদীর তৎকালীন এসপি শেখ রফিকুল ইসলামের অপকর্মের খবর জনসম্মুখে প্রকাশ হবার পরও তার নির্লজ্জ ও বেপরোয়া আচড়ন করার কারণে পুলিশের অনেক সৎ ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্যই, নিজেদেরকে পুলিশ পরিচয় দিতে বিব্রত বোধ করেন বলেও জানায় কেউ কেউ, অথচ বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল সোনালী ইতিহাস। শেখ রফিকুল ইসলামের এভাবে নির্বিঘ্নে একের পর এক অনৈতিক কর্মকান্ড করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণে, খোদ পুলিশ বাহিনীতেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ক্ষোভে ফেটে পড়েছে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যরা। খেটে খাওয়া ভুক্তভোগী দিনমজুর থেকে শুরু করে পাবনার শান্তিপ্রিয় জনগন বঙ্গবন্ধুকণ্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট জোর দাবি জানিয়েছে, পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলামকে অতিসত্বর পাবনা জেলা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার।

 

উপরে