খেলাপি ঋণ অবশ্যই একটি অপরাধ, কোনো ছাড় নয়
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, খেলাপি ঋণ অবশ্যই একটা অপরাধ। ঋণ নিয়ে পুরোপুরি ব্যবহার করতে না পারলে সেটি ঋণগ্রহীতার ব্যর্থতা। তবে দেখতে হবে কারা ব্যবসায়ী আর কারা অসাধু ব্যবসায়ী। অসাধু ব্যবসায়ীদের কোনো ছাড় নেই। আর যারা (ব্যাংকার) ঋণখেলাপিদের সহায়তা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বুধবার রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। রাজধানীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ নিরীক্ষা করা হবে। আপনাদের (ব্যাংকার) বিপদে ফেলতে নয়, নির্ভার করতেই এ নিরীক্ষা হবে। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। যারা ঋণ নিয়েছে, তারা কারা।
তারা যে ঋণপত্র খুলে মূলধনি যন্ত্র এনেছে, তা কোথায় বসিয়েছে, আমরা তা দেখব। তিনটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ শুরু করব। এমন একটা অবস্থানে নিয়ে আসতে চাই, যেখানে শুধু সততার বিজয় হবে, সবাই সত্য জানবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলোচনা করে এটা করা হবে।
ব্যাংকারদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণ দেয়ার আগে ঋণগ্রহীতাকে জানুন। যাকে চেনেন না, তাকে কেন ঋণ দেবেন। এখানে ব্যাংকার ও ঋণগ্রহীতা উভয় জানেন- যে টাকা ঋণ হিসাবে দেয়া বা নেয়া হচ্ছে, তা আর ফেরত আসবে না। তাহলে কীভাবে ঋণখেলাপি বন্ধ হবে।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, মালয়েশিয়ায় যেসব ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, তাদের নামের তালিকা সরকারিভাবে তৈরি করে বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ বিমানবন্দরেও এটি ঝোলানো হয়। এতে কেউ দেশত্যাগ করতে চাইলে তাকে আটক করা হয়।
মালয়েশিয়ায় এমন কোনো ঘটনা নেই যে কেউ ব্যাংকে ঋণখেলাপি হয়ে বিদেশে গিয়ে ফুর্তি করছে। ফলে পরবর্তী সময়ে যে কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় খেলাপিদের। এমনকি বিদেশে যাওয়া থেকেও বিরত থাকতে হয় ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের। কারণ মালয়েশিয়ায় খেলাপিদের কোনো ভিসা দেয়া হয় না। প্রয়োজনে বাংলাদেশেও আইন সংস্কার করে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হবে।
এই ব্যবসায়িক সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক। ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদ সদস্য মনজুর হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় বক্তব্য দেন ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান প্রধান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশে দুই ধরনের ব্যবসায়ী রয়েছেন। প্রথম শ্রেণী হল- যারা আসলেই ব্যবসা করতে চান, কিন্তু মাঝে মাঝে হোঁচট খান। হোঁচট খেয়ে খেলাপিতে পরিণত হন। তাদের প্রতি সহনশীল হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি ।
আরেক ব্যবসায়ী শ্রেণী আছেন, যারা টাকা ফেরত না দেয়ার জন্য ঋণ নেন। তাদের প্রতি তিনবার সাবধানবাণী উচ্চারণ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না। সেই টাকা আদায়ে যে ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার, সেটাই করা হবে। আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এনপিএল’র (নন-পারফরমিং লোন বা খেলাপি ঋণ) প্রকৃত মালিক জনগণ, দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে এই টাকা কাজে লাগে। এটার সঠিক ব্যবহারে উদ্দেশ্য পূরণ হবে, কিন্তু যারা এটার অপব্যবহার করেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গ্রহীতারা যে খাতে ঋণ নিতে চায় তার গুণগত মান বিবেচনা করে ঋণ দেয়ার পরামর্শ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, যে ব্যবসা শুরু করতে চান, ১০ বছর পরে এর যদি কোনো অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে সেই ঋণ কোনো দিনও ফেরত আসবে না। তাই ঋণ দেয়ার পর টাকাটা কোন কাজে লাগানো হচ্ছে, সে বিষয়ে তদারকিরও পরামর্শ দেন অর্থমন্ত্রী। আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ব্যাংকিং খাতের প্রকৃত চিত্র পেলে ভালো হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আমি ভালোভাবে চিনি। তিনি আতঙ্ক তৈরির জন্য কোনো কাজ করেননি। আমি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য আসিনি। ১৯৭৩ সাল থেকে আমি ব্যবসা করি। গ্রাহককে জেনেশুনে ঋণ দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য দুটি, একটি হচ্ছে গত বছরের অর্জন এবং কমতিগুলো উল্লেখ করা এবং পরবর্তী বছরে তুলনামূলক দুর্বল জায়গায় গুরুত্ব দিয়ে তা পূরণ করা।
এ বছর লোকসানি ব্যাংকের তালিকায় নাম না থাকায় রূপালী ব্যাংককে অভিনন্দন জানান ফজলে কবির। তবে তিনি বলেন, রূপালী ব্যাংকের জন্য চ্যালেঞ্জ হচ্ছে খেলাপি ঋণ। ডিসেম্বর শেষে রূপালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ১৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে এবং পরিচালন মুনাফা সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, এটি উন্নতির লক্ষণ। ব্যাংকের সার্বিক উন্নয়নে সুশাসনের যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর।
