‘একুশ-আছে-জয়োদ্ধত-একুশ-বাঁচে অবিরত ‘- অনুষ্ঠানমালা শুরু
একুশ মানে মাথা নত না করা। একুশ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। একুশ শেখায় ভাষাকে ভালবেসে অসাম্প্রদায়িকতাকে ধারণ করা। বায়ান্নর সেই চেতনার আলিঙ্গনে শুরু হলো অমর একুশে অনুষ্ঠানমালা। সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত এবারের অনুষ্ঠানের স্লোগান ‘একুশ আছে জয়োদ্ধত একুশ বাঁচে অবিরত।’ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের চৌদ্দ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। উদ্বোধনী আয়োজনে গান, কবিতা, পথনাটক ও নৃত্য পরিবেশনার সঙ্গে উচ্চারিত হয়েছে উচ্চ আদালতসহ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের দাবি। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে শহীদ মিনারকে পূর্ণাঙ্গ নক্সায় রূপান্তর এবং ভাষাসংগ্রামীদের একুশের প্রথম প্রহরে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের দাবি। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চলবে একুশের অনুষ্ঠানমালা। এরপর ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে অনুষ্ঠানটি স্থানান্তরিত হবে ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে। প্রতিদিন বিকেল চারটা থেকে নয়টা পর্যন্ত চলমান এ আয়োজনে ভাষা শহীদদের স্মরণ করে প্রতিদিন গাওয়া হবে গান, শিল্পীত উচ্চারণে পাঠ করা হবে কবিতা। পরিবেশিত হবে মুদ্রার সঙ্গে অভিব্যক্তির সমন্বিত নৃত্য, শিশু-কিশোর পরিবেশনা এবং মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনসহ বহুমাত্রিক বিষয়ভিত্তিক পথনাটক।
বিকেলে শহীদ মিনারের বেদিতে ভাষা শহীদদের স্মরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে শুরু হয় অনুষ্ঠান। জোট নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানান কবি, আবৃত্তিশিল্পী, নাট্যকর্মীসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। এরপর পালন করা হয় এক মিনিটের নীরবতা। মৌনতা শেষে গণসঙ্গীত সমন্বয় পরিষদের শিল্পীদের কণ্ঠ ভেসে বেড়ায় ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানের সুর। জাতীয় সঙ্গীতের পর গীত হয় একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। গান শেষে পরিবেশিত হয় একুশের স্মৃতি নিবেদিত নাচ। ‘রক্ত শিমুল রক্ত পলাশ/দিলো ডাক সুনীল ভোরের’ গানের নাচ নৃত্য পরিবেশন করে স্পন্দনের শিল্পীরা।
ভাষা শহীদদের নিবেদিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ। উদ্বোধনী আলোচনায় অংশ নেন একুশে অনুষ্ঠান উদ্যাপন পরিষদের আহ্বায়ক নাট্যব্যক্তিত্ব ঝুনা চৌধুরী। স্বরচিত একুশের কবিতাপাঠ করেন কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি তারিক সুজাত। ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিশিল্পী আহ্্কাম উল্লাহ্্।
সর্বস্তরের বাংলা ভাষা চালু না হওয়ার ক্ষোভ ছিল কামাল লোহানীর উদ্বোধনী বক্তব্যে। বলেন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম দাবি ছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। দ্বিতীয় দাবিটি ছিল, সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন। তৃতীয় দাবিটি ছিল, সব আঞ্চলিক ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। সেই চেতনাকে ধারণ করেই আজো বেঁচে আছি। অথচ আজ রাস্তাঘাটে বের হলে বাংলার বদলে ইংরেজি লেখা সাইনবোর্ড দেখে চরমভাবে হতাশ হতে হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়, রেস্তোরাঁ কিংবা কোচিং সেন্টারÑ সব কিছুতেই দেখি ইংরেজি সাইনবোর্ড। উচ্চ আদালত থেকে সর্বত্র বাংলা ভাষায় নথিপত্র প্রচলনের নির্দেশ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অথচ স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মাতৃভাষা প্রতি উদাসীনতা দেখিয়ে আমরা ভাষা শহীদদের অবমাননা করছি। বাঙালী হিসেবে আমরা যে কোন ভাষারই চর্চা করতে পারি তাই বলে মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা করে নয়। শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেও রয়েছে গলদ। ভাষার মর্যাদাকে রক্ষা করতে হলে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। বর্তমান সরকারের দুটি প্রস্তাব পেশ করে এই সংস্কৃতিজন বলেন, নানা সঙ্কটময় মুহূর্ত পেরিয়ে বর্তমান সরকার উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা শহীদদের রক্ত ঋণের কথা ভুলে গেলে চলবে না। তাই একুশের প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পরই ভাষাসংগ্রামীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে মূল নক্সা অনুযায়ী রূপ দিতে হবে শহীদ মিনারকে। ভাস্কর নভেরার যে নক্সায় ছিল ভাষা আন্দোলনের চিত্রিত শিল্পকর্ম। সেই নক্সাকে অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া রাস্তাঘাটে আর কোন ইংরেজি সাইনবোর্ড দেখতে চাই না। বিদেশীদের প্রয়োজনে সাইনবোর্ডে বাংলার নিচে ছোট করে ইংরেজী থাকতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে গোলাম কুদ্দুছ বলেন, বাহাত্তরের সংবিধানে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা প্রদান করা হয়। অথচ সেই সংবিধানকে লঙ্ঘন করে উচ্চ আদালতে ইংরেজীতে কার্যক্রম চলছে। একইভাবে উচ্চশিক্ষায়ও বাংলা ভাষার প্রবর্তন নেই। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অনুবাদের মাধ্যমে বাংলা ভাষা প্রচলনের উদ্যোগ নিতে হবে রাষ্ট্রকে। হীনমন্যতা পরিহার বাংলার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
শহীদ মিনারে ভাষা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা নিবেদনে অগ্রাধিকারের দাবি তুলে হাসান আরিফ বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পরই যেন ভাষাসৈনিকরা শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। ভাষাসংগ্রামীদের প্রতি কোন উদাসীনতা আর দেখতে চাই না। একুশে ও স্বাধীনতা পদক প্রদানে যোগ্য ব্যক্তিদের মনোনীত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এই দুটি পদকের সঙ্গে জড়িয়ে বায়ান্ন ও একাত্তরের চেতনা। অথচ আমরা প্রায়ই এই পদকপ্রাপ্ত অনেককে নিয়েই প্রশ্ন তুলছে তরুণ প্রজন্ম। তারা জেনে বুঝেই সে প্রশ্ন তুলছে। সরকারের প্রতি আহ্বান- রাষ্ট্রীয় এই দুটি পদক যেন সঠিক ব্যক্তিদেরই প্রদান করা হয়, যাতে করে পদকপ্রাপ্তদের নিয়ে কোন বিতর্ক সৃষ্টি না হয়।
‘ফাগুন দিন আঁকি’ শীর্ষক স্বরচিত একুশের কবিতাপাঠ করেন কবি তারিক সুজাত। আলোচনা শেষে ছিল গান, কবিতা ও পথনাটকে সজ্জিত সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। বাচিকশিল্পী আশরাফুল আলম পাঠ করেন মাহবুব উল আলম চৌধুরী রচিত ভাষা আন্দোলনের প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’। একক কণ্ঠে দেশাত্মবোধক সঙ্গীত পরিবেশন করেন সমর বড়ুয়া, আরিফ রহমান ও আবিদা রহমান সেতু। ‘আগুনের জবানবন্দি’ শিরোনামের পথনাটক পরিবেশন করে নাট্যদল আরণ্যক। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মাসকুর-এ-সাত্তার কল্লোল।
