পেশীশক্তি প্রদর্শন ও কালো টাকার প্রভাব বিনষ্ট করছে নির্বাচনের উৎসবমুখর পরিবেশ
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ডামাঢোল শুরু হয়েছে বেশ জোরেশোরেই। মেয়র, কাউন্সিলর, সংরক্ষিত আসনের মহিলা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরাসহ ঢাকা উত্তর নগরবাসী যখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার দিনক্ষণের জন্য, ঠিক তখনই অপেক্ষাকৃত বিত্তশালী ও তথাকথিত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াপ্রাপ্ত প্রার্থীদের কালোটাকা এবং বিশেষ বাহিনীর দাম্ভিকতা ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, অর্থবিত্ত-প্রভাব প্রতিপত্তিতে পিছিয়ে থাকা খোদ প্রার্থীসহ তাদের কর্মী-সমর্থকবৃন্দ। অভিযোগ উঠেছে, কৌশলে নানা ধরনের উপহার সামগ্রী প্রদানসহ নগদ টাকার বিনিময়েও ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনা করছে ধনকুবের প্রাথীদের নির্বাচনী প্রচার কার্যে নিয়োজিত লোকজন। রাজনৈতিক উচ্চপদস্থ নের্তৃবৃন্দের আশীর্বাদপ্রাপ্তির নাম করে তাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে হরেক রকমের মূল্যবান উপঢৌকনসমূহ। সেসমস্ত অগাধ জলের মাছরূপী রাজনীতিবিদরা প্রকাশ্যে কোনও কর্মতৎপরতা না দেখালেও, পর্দার আড়ালে থেকে কলকাঠি নেড়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেও অভিযোগ করেন কেউ কেউ। ফলে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে বঞ্চিত অন্যান্য কাউন্সিলর কিংবা মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মাঝে। রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্যকে ভূলুন্ঠিত করে, একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগারে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর গুণকীর্তন ও সাফাই গাইছে প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থীর কর্মীবাহিনী। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বাগবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়ার কারণে, সাধারণ ভোটারদের মাঝে দেখা দিয়েছে চরম উদ্বেগ-উৎকন্ঠা। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভোটারের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তারা জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে তাদের আগ্রহের কমতি নেই, কিন্তু প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারনার কাজে চিহ্নিত মাস্তান, সন্ত্রাসী, বিভিন্ন মামলার দাগী আসামী, চাঁদাবাজদের ব্যবহার করায় নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই তারা শংকিত হয়ে পড়ছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ব্যানার-পোষ্টার ছিড়ে ফেলারও ঘটনা ঘটছে অহরহ। এক্ষেত্রে একজন আরেকজনকে দোষারোপ করার কারণে ভুক্তভোগী প্রার্থী ও তাদের কর্মী সমর্থকদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে, যা থেকে ঘটে যেতে পারে মারাত্মক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মতো ঘটনা। বিঘিœত হতে পারে নির্বাচনের অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ। কালো টাকার দাপটের কাছে সৎ, মেধাবী, যোগ্য প্রার্থীদের কোণঠাসা হয়ে পড়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর, মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছে অনেক কাউন্সিলর, মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীগণ। প্রার্থীদের এমন হতাশ হওয়ার ঘটনায় দ্বিগুন উৎসাহ-উদ্দীপনায় আরোও বেশি করে সন্দেহ আর অবিশ^াস উদ্রেককারী, মনগড়া রটনা চাউর করে দিচ্ছে চতুর প্রার্থীরা। যাতে করে ভগ্নমনোরথ হওয়া প্রার্থীরা প্রচারণা না চালিয়ে, নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সে সুযোগকে কাজে লাগিয়ে, শুধুমাত্র কালো টাকা আর পেশীশক্তির মাধ্যমে ভয়-ভীতি প্রদর্শণ করে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যায় ধুরন্ধর সে সকল প্রার্থীরা। অনেক আশা-আকঙ্খায়, ত্যাগ স্বীকার করা, জনগনের সেবা করার মানসে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেওয়া প্রাথীরা, জনগনের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের স্বতষ্ফূর্ত ভোটে পাশ করার অপার সম্ভাবনা থাকার পরও, শুধুমাত্র আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে নির্বাচনকে উৎসবের না ভেবে, ইতোমধ্যে নিরানন্দ যন্ত্রণার কারণ বলেও মনে করছেন অনেকেই। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভোটারদের সাথে আলাপকালে তারা জানায়, স্থানীয় ভোটারদের চেয়ে ভাসমান ভোটার বেশি থাকায় নির্বাচনে কালো টাকার ব্যাপক ছড়াছড়ি নির্বাচনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকেই নষ্ট করে দিচ্ছে। জনশ্রুতি রয়েছে, ভোটারদের মধ্যে অনেকেই কোনওরূপ বাছবিচার, যাচাই-বাছাই না করে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো গুজবকে পূঁজি করে টাকার বিনিময়ে নিজের মূল্যবান ও পবিত্র ভোট প্রদানের আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে প্রায় সকল প্রার্থীকেই। প্রায় প্রতিদিনই শোডাউন দেয়া, বিপুল অর্থবিত্তের অধিকারী প্রাথীরা আড়ালে-আবডালে পরোক্ষভাবে প্রচার করছেন যে, রাজনৈতিকভাবে দলীয় হাই কমান্ড তাদেরকেই সমর্থন দিয়েছে। এতে করে দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মাঝেও দেখা দিয়েছে দ্বিধা-দ্বন্ধ, সন্দেহ। রাজনীতি সচেতন কয়েকজন ভোটার এ সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, যার টাকা আছে তার সবই আছে। আর যার টাকা নাই, তার কোনও কিছুই নাই। আমরা আমজনতা চাই একটি সুন্দর, অবাধ,সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ঢাকা উত্তর নগরবাসী তাদের পছন্দের যোগ্য প্রার্থীকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করে, ঢাকাকে গড়ে তুলুক বিশ্বের একটি আধুনিক শহর হিসেবে। নির্বাচন কমিশনের উচিত হবে, যত দ্রুতসম্ভব উদ্ভূত পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে সংঘর্ষ, রক্তপাতহীন এবং বিশ্বাসযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দেওয়া।” প্রধান নির্বাচন কমিশনার (ইসি) এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সাধারণ ভোটারদের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে, তাদের আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটানোর এখনই সময়।
