ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬
আপডেট : ৩১ মে, ২০১৯ ১২:৪৪

রোহিঙ্গা সংকট অন্য কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষণীয়

‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ বিষয়ক’ ২৫তম আন্তর্জাতিক নিকেই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
রোহিঙ্গা সংকট অন্য কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষণীয়

 

ডেস্ক রিপোর্ট
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট অন্য কোনো সংকটময় পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে একটি শিক্ষণীয় বিষয়। শান্তি, মানবতা ও উন্নয়নের মাধ্যমে কীভাবে বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটানো যায়, তার জন্য রোহিঙ্গা সংকট উদাহরণস্বরূপ। গতকাল বৃহস্পতিবার জাপানে ইম্পেরিয়াল হোটেলে ‘এশিয়ার ভবিষ্যৎ বিষয়ক’ ২৫তম আন্তর্জাতিক নিকেই সম্মেলনে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী এসব বলেন প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘সিকিং এ নিউ গ্লোবাল অর্ডারÑওভারকামিং দ্য ক্যাওস।’ 
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতা, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও তাত্ত্বিকদের অংশগ্রহণে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে এ সম্মেলনের উদ্বোধন হয়। জাপানি সম্প্রচারমাধ্যম নিকেই-এর এ আয়োজনকে এশিয়ার সম্ভাবনা ও উত্থান নিয়ে এ অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ছাড়াও ‘আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি’ হিসেবে পরিচিত মাহাথির মোহাম্মদ, কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এবং ফিলিপিন্সের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে অংশ নিচ্ছেন এ সম্মেলনে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা তীব্র উত্তেজনা ও সংকটের মুখেও এই দ্বন্দ্বের বিষয়ে সমঝোতা ও ঐকমত্য চেয়েছি। আমরা শুধু মানবিক আহ্বানে সাড়া দিচ্ছি না; বরং আঞ্চলিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সংকট যেন আর না বাড়ে, সে বিষয়েও সচেতন। তিনি বলেন, আমাদের প্রচণ্ড সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আমরা জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছি। বিশ্ব সম্প্রদায়ের একজন সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও টেকসই বিশ্ব নিশ্চিত করতে সব বন্ধু ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবে, বলেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গা সংকট এ অঞ্চলের অন্যান্য সংকটময় পরিস্থিতিতে কীভাবে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেদিকে একটি শিক্ষণীয় দিক। 
শান্তি, মানবতা ও উন্নয়নের মাধ্যমে কীভাবে বিশ্বে বিশৃঙ্খলা দূর করা যায়, তার একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। তিনি আরো বলেন, এটি বিশ্বের অনেক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও, মানুষের জ্ঞান অন্বেষণ করা, নতুন আবিষ্কার করা এবং সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার বিষয়ে তাঁকে আশা জোগায়। বাণিজ্য যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমিত করে এশীয় দেশগুলো কীভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে সমৃদ্ধির পথে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে পারে, সেই পথ খোঁজার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। নানা চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতে জর্জরিত বর্তমান বিশ্ব কাঠামোতে কীভাবে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সমতার ভিত্তিতে উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে নিজের ভাবনা তিনি তুলে ধরেন ‘দ্য ফিউচার অব এশিয়া’সম্মেলনে। শেখ হাসিনা বলেন, মানবতা আর শুভ শক্তির জয় হবেই। বিশ্ব আজ অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, এই উদীয়মান এশিয়ার দিকে। 
উদ্ভাবনে, অনুপ্রেরণায় বিশ্বকে শান্তি আর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে এশিয়াকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার গল্প সম্মেলনে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এশিয়ার দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য উদারীকরণের নীতি সমর্থন করে এলেরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতির বাধা ক্রমশ বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের ওই সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতি বিশ্বে বাণিজ্য যুদ্ধের উসকানি দিচ্ছে। অর্থনীতির সহজ কথা হল, শুল্ক যদি বাড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার কমবে। আমি আশা করব, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার মধ্যে সংরক্ষণমূলক বাণিজ্য নীতির প্রবণতা কমিয়ে আনতে কী করা যায় এবং এ ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা কীভাবে আরও বাড়ানো যায়- সেই পথনির্দেশ এই ফোরাম থেকে উঠে আসবে। এ বিষয়ে নিজের ভাবনার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের বিশ্ব নানাভাবে চ্যালেঞ্জ ও সংঘাতের মুখোমুখি। বিশ্বকে আরও উন্মুক্ত করতে, ঐক্যের বন্ধনকে আরও মজবুত করার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বিশ্বের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের মোকাবেলা করতে হবে যৌথভাবে; ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকারকে রক্ষা করতে হবে। 
উদ্ভাবনী ধারণা ও পদক্ষেপ নিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বাড়াতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে বিশ্বের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোতে আরও উদ্ভাবনী অনুশীলনের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সবার জন্য লাভজনক হয়, সব মানুষের যাতে মঙ্গল হয়- তেমন একটি কৌশল নির্ধারণ করতে হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে, যা গড়ে উঠবে পারস্পরিক আস্থা ও সম্মান এবং ঐক্যবদ্ধ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির চেতনা নিয়ে। সেজন্য উদার, অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাভিত্তিক, অংশীদারিত্বমূলক যৌথ উন্নয়নের চেতনা নিয়ে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এশিয়ার ভবিষ্যত নির্ভর করছে টেকসই ও সুষম উন্নয়নের উপর, আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা এবং সবার জন্য লাভজনক একটি ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর। আমাদের যৌথভাবে উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। আমরা বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য একটি গ্রুপ হিসাবে একত্র হতে পারি, যারা একটি বহুমাত্রিক বিশ্ব ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা করবে। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ সবসময় শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার ওপর জোর দিয়েছে, যা থেকে সরাসরি উপকৃত হবে জনগণ। একটি বহুমত্রিক বিশ্বে বহু-পক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আমরা জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চালিয়ে যাব। 
এশিয়া ও বাইরের অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি পেলে সবারই সম্পদের জোগান বাড়বে বলে মত দেন প্রধানমন্ত্রী। তার ভাষায়, বাণিজ্যের পাশাপাশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্য দিয়েই এটা সম্ভব। মানুষে মানুষে এই যোগাযোগই পারে বিশ্বজুড়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির ভিত্তি স্থাপন করে দিতে। অবকাঠামো, মুক্ত বাণিজ্য এবং উদার বিনিয়োগ নীতিই এশিয়ার বিকাশের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, এখন আমরা অভূতপূর্ব সম্পদ ও সম্ভাবনার হাতছানি দেখতে পাচ্ছি, যেখানে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, শিক্ষার ?সুযোগ আরও উন্মুক্ত হচ্ছে, শিশুমৃত্যুর হার কমে আসছে এবং দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাচ্ছে। একসময় এসব কল্পনা করাও কঠিন ছিল। শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব সম্প্রদায়ের সদস্য হিসাবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্থিতিশীল ও টেকসই বিশ্ব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সব বন্ধু ও অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করে যাবে। মানব সভ্যতাকে যুদ্ধের বিভিষিকার শিকার হতে হয়েছে বহুবার, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবেলা করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমি বিশ্বাস করি, শক্তিশালী, যৌক্তিক ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বে দেশে দেশে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সামনের দিনের চ্যালেঞ্জগুলো যদি আমরা মোকাবিলা করতে পারি, তা ভালো ফলই বয়ে আনবে।

উপরে