চ্যালেঞ্জের মুখে রফতানি খাত
রফতানি আয় কখনো কমছে, আবার কখনো বাড়ছে। অর্ধাৎ টালমাটাল অবস্থা দেশের রফতানি আয়ে। কোভিড-১৯ এর প্রভাবে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বিশ্ববাণিজ্যে। এতে চলতি বছরের এপ্রিলে আশঙ্কাজনক হারে দেশের রফতানি আয় কমে যায়। এর পরের মাস মে তে আগের মাসের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি আয় করেছে বাংলাদেশ।
তবে গত অর্থবছরের মে মাসের চেয়ে চলতি অর্থবছরের মে মাসে রফতানি আয় কম হয়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ। কোভিড-১৯ এর এই সময়ে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রফতানি খাত।
গত সোমবার প্রকাশিত রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১৪৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। আগের মাস এপ্রিলে এর পরিমাণ ছিল মাত্র ৫২ কোটি ডলার। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত অর্থবছরের মে মাসের চেয়ে চলতি অর্থবছরের মে মাসে রফতানি আয় কম হয়েছে প্রায় ৬১ শতাংশ। গত এপ্রিলে কমেছে ৮৩ শতাংশ। আগামী মাসগুলোতেও রফতানি আয়ে এই নেতিবাচক প্রবণতা কমে আসবে বলে আশা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে ১ হাজার ১৫০ কারখানার ৩১৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। ৪৬০ কোটি টাকা মূল্যের হিমায়িত চিংড়ির ২৯৯টি ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল করেছে বিদেশি ক্রেতারা। দুই মাস ধরে সবজি রফতানি বন্ধ। আসবাবে নতুন কোনো ক্রয়াদেশ আসছে না। আর চীনের কারণে গত জানুয়ারিতে প্রথম চামড়া খাতেই বিপর্যয় নেমেছিল। ইউরোপ ও আমেরিকায় করোনা জেঁকে বসার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের পণ্য রফতানি খাত টালমাটাল হয়ে পড়েছে। দিন যত গড়াচ্ছে সংকট ততই বাড়ছে। রফতানি আয় ধারাবাহিক কমছে। কাজ না থাকায় কারখানাও বন্ধ হচ্ছে। শ্রমিকদের চাকরি হারানোর শঙ্কা বাড়ছে। করোনায় আক্রান্তের এই সময়ে গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে রফতানি খাত।
সার্বিকভাবে চলতি অর্থবছরের জুন থেকে মে মাস পর্যন্ত গত ১১ মাসে রফতানি কম হয়েছে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ। এই সময়ের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কম হয়েছে ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এ সময়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১৫৫ কোটি ডলার। রফতানি হয়েছে তিন হাজার ৯৫ কোটি ডলারের পণ্য। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৭৭৫ কোটি ডলার। ইপিবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে তৈরি পোশাক রফতানি করে আয় করেছে মাত্র দুই হাজার ৫৭০ কোটি ডলার। যা গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল তিন হাজার ১৭৩ কোটি ডলার। পোশাক রফতনি করে আয় হয়েছে ২৫ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার। লক্ষ্য ছিল ৩৪ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের এই ১১ মাসে আয় হয়েছিল ৩১ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার। গত ১১ মাসে তৈরি পোশাকের রফতানি কমেছে ১৯ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
টেরিটাওয়েলসহ পোশাক খাতের সমজাতীয় পণ্য মিলে মোট রফতানিতে পোশাক খাতের অবদান ৮৬ শতাংশ। এ খাতের উদ্যোক্তাদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ মাসে মে মাসে ওভেন ও নিট খাতে পোশাক রফতানি কমেছে যথাক্রমে ১৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ ও ১৯ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সঙ্গে কমেছে লক্ষ্যমাত্রাও। পাট ও পাটপণ্য এবং আসবাব ছাড়া কোনো খাতের রফতানি আয় ইতিবাচক ধারায় নেই।
বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান পণ্য রফতানি খাতের এই কঠিন সময়ে জাতীয় বাজেট ঘোষণা করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। অন্যদিকে রফতানিতে ঘুরে দাঁড়াতে বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা নতুন করে সুযোগ-সুবিধা দাবি করেছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি না পেলে রফতানি আয় বাড়বে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আমাদের শিল্প কারখানাগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এজন্য কারখানা মালিক এবং সরকার সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে। তাদেও মতে, চীন থেকে ক্রয়াদেশ সরলে বাংলাদেশের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ বাংলাদেশী তৈরি পোশাকের বড় বাজার। আর পোশাকই ৮০ শতাংশের বেশি রফতানি আয় নিয়ে আসে। করোনায় প্রথম ধাক্কায় ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত হওয়ায় পোশাক রফতানি ব্যাপকহারে কমে গেছে। নতুন ক্রয়াদেশের পরিমাণও কম। যদিও সংকটের একেবারে শুরুতেই পোশাক শ্রমিকদের তিন মাসের মজুরি দিতে ৫ হাজার কোটি টাকার তহবিল দিয়েছিল সরকার। তারপরও শ্রমিক ছাঁটাইয়ের মতো ঘটনা ঘটছে। ঈদের পর সেটি নতুন করে বেড়েছে। অন্যদিকে ৪২০টি কারখানাও বন্ধ হয়েছে।
ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের মে মাসে দেশের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৪১০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এ সময় আয় হয় মাত্র ১৪৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মে মাসের চেয়ে এই আয় ৬১ দশমিক ৫৭ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ৬৪ দশমকি ৩৪ শতাংশ। গত অর্থবছরের এই সময় আয় ছিল ৩৮১ কোটি ৩৩ লাখ ডলার।
উদ্যোক্তারা জানান, করোনার প্রভাবে আগের মাস গত এপ্রিলে স্মরণকালের সবচেয়ে কম আয় হয়েছে। এপ্রিলে মাত্র ৫২ কোটি ডলার রফতানি আয় অর্জিত হয়। আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮৩ শতাংশ আয় কমেছে এপ্রিলে। মার্চে কিছুটা কম আসলেও সে মাসে করোনার প্রভাবটা পুরোপুরি বোঝা যায়নি। এ কারণে রফতানি হ্রাসের হারটা ছিল মোটামুটি সহনীয়। রফতানি কম ছিল ১৮ শতাংশ। তবে বিশ্ববাজারে করোনার হানা বাংলাদেশের আগেই শুরু হওয়ায় ফেব্রুয়ারি ও মার্চ থেকেই রফতানি আদেশ কমতে শুরু করে। মার্চে নতুন রফতানি আদেশ প্রায় বন্ধ ছিল। এপ্রিলজুড়ে বলতে গেলে পণ্য জাহাজীকরণ হয়নি। মে মাসে কিছুটা রফতানি আয় বেড়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, অন্যান্য বড় পণ্যের মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি কমেছে ২১ শতাংশের বেশি। লক্ষ্যমাত্রা থেকে আয় কম হয়েছে ২৬ শতাংশ। রফতানি হয়েছে মাত্র ৭৩ কোটি ৯৩ লাখ ডলারের পণ্য। গত বছরের এই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৯৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। চিংড়িসহ হিমায়িত মাছের রপ্তানি কম হয়েছে ১০ শতাংশ। রফতানি হয়েছে ৪২ কোটি ৬৬ লাখ ডলারের পণ্য। বিভিন্ন ধরনের কৃষি পণ্যের রফতানি কম হয়েছে ৮ শতাংশের বেশি। ৭৮ কোটি ডলারের কৃষিপণ্য রফতানি হয়েছে গত ১১ মাসে। করোনায় ছোট-বড় সব পণ্যেরই রফতানি প্রবাহের একই চিত্র। ব্যতিক্রম শুধু ওষুধ, আসবাব ও পাট। করোনাকালেও কাঁচা পাটসহ সব ধরনের পাটপণ্যের রফতনি বেড়েছে। পাট ও পাটপণ্যের রফতানি বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মে পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭৫ কোটি ২৫ লাখ ডলার। এই সময়ে রফতানি আয় হয়েছে ৮১ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। গত অর্থবছরে এই সময়ে আয় হয়েছিল ৭৭ কোটি ৩৫ লাখ ডলার। অর্থাৎ পাট ও পাটজাত পণ্যে ১১ মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেড়েছে ৮ দশমকি ৬৯ শতাংশ ও গত বছরের চেয়ে আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। একইভাবে ওষুধের রফতানি আয় বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ। যদিও লক্ষ্যমাত্রা থেকে রফতনি আয় ২১ শতাংশ কমেছে। এ সময় মোট ১২ কোটি ডলারের ওষুধ রফতানি হয়েছে।
