বাবা বেঁচে নেই জানে না ওরা
সানোয়ার হোসেন (৫৬)। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এই কর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আজ পাঁচ দিন হলো। তার দুই শিশু কন্যাসহ পরিবারের চারজনও করোনায় আক্রান্ত। তবে তার সন্তানরা জানে না তাদের বাবা আর বেঁচে নেই। তাদের বলা হয়েছে, বাবাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সুস্থ হলেই বাড়ি ফিরে আসবেন তিনি। এই ঘটনা শেরপুর জেলা শহরের বাগরাকসার কাজীবাড়ি এলাকার। গত মঙ্গলবার ভোররাতে তীব্র শ্বাসকষ্টে মারা যান সানোয়ার।
সানোয়ারের সহধর্মিনী তাসলিমা বলেন, দুই মেয়ে এখনো জানে না ওদের বাবা আর বেঁচে নেই। ওরা দু’জন বারবার বাবার কথা জানতে চাইছে। উত্তরে বলেছি, তাদের বাবাকে সরকারি খরচে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। সুস্থ হলেই ফিরে আসবেন। বলতে বলতে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকেন তাসলিমা।
চোখ মুছতে মুছতে আবার বলেন, সত্য বলার শক্তি আমি হারিয়ে ফেলেছি। স্বামীর মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় আর ঘুম আসছে না। ছেলেমেয়েরাও করোনায় আক্রান্ত। দিন যাচ্ছে আর ওদেরও শরীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছেলেমেয়েদের চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তাসলিমার যমজ দুই মেয়ে তানহাত (১৪), তাশমি (১৪) এবং ছেলে তানভির অনিক (২১) ও ছোট বোন ফারহানা ববি (৩৩) করোনায় আক্রান্ত। এছাড়া তিনি নিজেও ডায়াবেটিস, থায়রয়েড, গলাব্যাথা ও প্রচন্ড মানসিক চাপে ভুগছেন।
শুক্রবার (১৯ জুন) রাতে তাসলিমার সাথে কথা হয় বাংলাদেশ জার্নালের এই প্রতিবেদকের। এ সময় তিনি জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে সাহায্য-সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
জানা যায়, সানোয়ার হোসেন পিডিবি ঢাকার পল্টন শাখায় হিসাবরক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন শেরপুর পিডিপি কর্মচারি ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি ছিলেন।
সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ারুর রউফ জানান, করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত মঙ্গলবার ভোর রাতে তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে তিনি মারা যান। তার বাড়ি শেরপুর শহরের বাগরাকসার কাজীবাড়ি এলাকায়। সানোয়ারের মৃত্যুর পর তার পরিবারের পাঁচ সদস্যের কাছ থেকে করোনা নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরদিন বুধবার রাতে হাতে পাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী ওই নমুনাগুলোর মধ্যে চারজন করোনা শনাক্ত হন। এখন তারা নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে আছেন। এছাড়া বাড়িটি লকডাউন করা হয়েছে।
তাসলিমা জানান, তার স্বামী যখন করোনা শনাক্ত হয়ে নিজ বাড়িতে আইসোলেশনে ছিলেন। তখন প্রতিবেশীরা তাদের ঘরে ঢিল ছুড়তো। নানা ধরনের বাজে উক্তি করে নাজেহাল করতো। পরে বিষয়টি সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুনকে জানানো হয়। এর পরপরই তিনি এলাকায় এসে স্থানীয়দের উত্ত্যক্ত করতে নিষেধ করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন।
তাসলিমা বলেন, এ জীবনে হয়ত কোন একটা ভালো কাজ করেছিলাম, যে কারণে আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা আমার এ মহাবিপদে পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য ও সহযোগীতা করে যাচ্ছেন। নিরাপত্তা দেয়ার পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধপত্র দিচ্ছেন তারা।
তাসলিমা আরও বলেন, আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি ততক্ষণ পর্যন্ত সন্তানদের সাথে নিয়েই বাঁচতে চাই। যদি মরে যাই তাহলে সন্তানদের দেখাশুনার দায়িত্ব যেন প্রশাসন নেয়। আর যদি আমরা সবাই মারা যাই তাহলে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সঠিকভাবে সবার সৎকারের ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে অবেদন জানান তিনি।
তাসলিমা বলেন, আত্মীয় স্বজনরা তেমন খোঁজ নিচ্ছে না। আর আমরাও ঘরের বাইরে বের হতে পারছি না। এমন পরিস্থিতিতে ওসি সাহেব আনুসাঙ্গীক ওষুধপত্র ও নানা ধরণের খাবার বাড়িতে পৌঁছে দিচ্ছেন, যা দিয়ে আমার সন্তানরা এখনও বেঁচে আছে। তিনি প্রতিদিন ফোন করে খবর নিচ্ছেন। নিরাপত্তার জন্য দিনে দুইবার করে পুলিশের গাড়ি বাড়ির চারপাশে টহল দিচ্ছে। এছাড়া পুলিশ সুপার কাজী আশরাফুল আজীম বিভিন্ন সময়ে ফোন করে খবর নিচ্ছেন।
ডায়াবেটিক সমিতির সভানেত্রী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলেন, আমি তাসলিমার ছেলে করোনায় আক্রান্ত তানভির অনিকের সাথে কথা বলেছি। তাকে আশ্বস্ত করেছি তাদের যেকোন সাহায্য সহযোগীতা ও প্রয়োজনে পাশে থাকবো।
সানোয়ার হোসেনের ছেলে তানভির অনিক করোনা শনাক্ত হওয়ার পর গেল বুধবার নিজের ফেসবুক ওয়ালে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেয়। সেখানে অনিক লেখে, 'মাননীয় পুলিশ সুপার ও মাননীয় ওসি সাহেব আমাদের খোঁজ নিয়েছেন। আমি ও আমার মা হাসপাতালে থাকা মুহূর্তে আমাদের পরিবারের যেসব সদস্যরা বাসায় ছিলেন, তাদের জন্য খাদ্যসামগ্রী, ফলমূল ও খোঁজখবর নিতেন। এমনকি হাসপাতালেও আমাদের জন্য খাবার ও পানির ব্যবস্থা করতে ওসি সাহেব নিজে এসেছিলেন। ধন্যবাদ দিয়ে জেলা পুলিশকে ছোট করবো না। আমি ও আমার পরিবার তাদের কাছে ঋণী। বিশেষ করে ওসি সাহেবের ভূমিকা আমরা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে রাখবো। আল্লাহ তাকে দীর্ঘজীবী করুন। বর্তমানে আমাদের শারীরিক অবস্থার অবনতির দিকে। আশাকরি সুষ্ঠু চিকিৎসা পাবো ও আল্লাহর রহমতে সবাই সুস্থ হয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।'
সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মানবিক পুলিশের চোখে, জনতার আকাঙ্খা লেখা থাকে এই শ্লোগানকে সামনে রেখে কাজ করছে জেলা পুলিশ। আর সেই নৈতিক দায়িত্ববোধের তাগিদে পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ওই করোনা আক্রান্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।
সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং করোনা সম্পর্কিত তথ্য নিশ্চিতকারি ডা. মোবারক হোসেন জানান, ওই চার করোনা শনাক্ত রোগীকে চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়েছে। এর বাইরে তাদেরকে গরম পানি পান এবং গারগল করতে বলা হয়েছে। এছাড়া টক জাতীয় খাবার খেতে পরামর্শ দেয়া হয়। পাশাপাশি ঘরের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং প্রত্যেককে আলাদা বাথরুম ব্যবহার করতে বলা হয়েছে।
বুধবার (১৭ জুন) ওই চারজনের দেহে করোনা শনাক্ত হন। চিকিৎসা চলাকালিন অবস্থায় সাতদিন পর পুনরায় তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে বলে জানান তিনি।
