করোনায় নতুন জীবিকা
মনির হোসেন। অসুস্থ মা-বোনকে নিয়ে তেজগাঁও নাখালপাড়ায় ভাড়া থাকেন। বেতনের ওপর নির্ভর করে তার সংসার। মহাখালীতে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে মার্কেটিংয়ে কাজ করতেন। কিন্তু করোনার কারণে তার কর্মক্ষেত্র ৩ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। বাসা ভাড়া ও মায়ের চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় কোন পদ না পেয়ে ভ্যানে করে তেজগাঁওয়ের এলাকার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি শুরু করেন।
আরেকজন মো. রিয়াজ। মোহাম্মদপুর এলাকায় ফল বিক্রি করেন। তিনি জানান, তার শ্যামলী এলাকায় একটি খাবার হোটেল ছিল। করোনায় ক্রেতা কমে যাওয়ায় হোটেলে বিক্রি কমছে, অন্যদিকে মাসিক দোকান ভাড়া ১২ হাজার টাকাসহ কর্মচারীদের বেতন ৩০ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে। গত তিন মাসে ৯০ হাজার টাকা নগদ পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে। লোকসানের মুখে পড়ে হোটেলটি বন্ধ করতে হয়েছে। এজন্য একক মালিকানাধীন হোটেল ব্যবসা গুটিয়ে এখন মৌসুমি ফল বিক্রি করছেন।
একই অবস্থা মাহিম চৌধুরীর। রাজধানীর একটি বেসরকারি পার্কে কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করতেন। কিন্তু করোনার কারণে পার্কটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তার বেতন আটকে যায়। চার মাস ঘরে বসে থেকে নতুন করে অনলাইনে ব্যবসা করার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, সংসারে স্ত্রী গর্ভবতী, এমন সময়ে চাকরি অনিশ্চিত। সংসার চালানো, স্ত্রীর চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। সেজন্য নতুন পেশা হিসেবে অনলাইনে ব্যবসা শুরুর চেষ্টা করছেন তিনি।
অপরদিকে, সদরঘাট এলাকায় কথা হয় বরিশাল জেলার বাকেরগঞ্জ এলাকার হারুনের সাথে। তিনি বলেন, রাজধানীর ধানমন্ডি স্কুলে সামনে মুড়ি ও চানাচুর, আচার বিক্রি করতাম। ওই দোকান দিয়ে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হতো। করোনায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত তিন মাস জমানো টাকা খরচ করেছি। এখন আর পারছি না। তাই স্ত্রী ছেলে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামে বাড়ি চলে যাচ্ছি। বাড়ি গিয়ে কী করবেন জানতে চাইলে হারুনের উত্তর, কৃষি কাজ করবো।
এমন জীবন যুদ্ধ মনির হোসেন, রিয়াজ ও হারুনের মত অনেকেই করে চলছে। একদিকে করোনা শঙ্কা রয়েছে অন্যদিকে চাকরি হারিয়ে নতুন জীবিকার আয়ে সংসার চালিয়ে প্রাণান্ত চেষ্টা। এমনকি লজ্জায় কেউ কেউ তার পেশা পরিবর্তনের বিষয়টি বাসায় পর্যন্ত জানায়নি।
রাজধানীর লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, কাটাসুরসহ অনেক এলাকার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। টাঙানো আছে ‘দোকান ভাড়া দেওয়া হবে’ লেখা বিজ্ঞাপন। এরই সাথে দেখাও যাচ্ছে ‘বাসা ভাড়া’র সাইনবোর্ড।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জীবিকার তাগিদে অনেকে পেশা বদল করছেন। তবে এটি সাময়িক, স্থায়ী হবে না। করোনাভাইরাস সংক্রমণ কমে এলে যারা পেশা পরিবর্তন করেছেন তারা আগের জায়গায় ফিরে আসবেন। অনেক শিক্ষিত মানুষ চাকরি হারিয়ে নতুন নতুন পেশা নিয়ে বসছেন। এটি হয়তো বেঁচে থাকার জন্য। তবে এটি দীর্ঘ মেয়াদে থাকবে না।
