logo
আপডেট : ৮ আগস্ট, ২০১৮ ১৮:৩২
খরচ কমাতে ৩২ নম্বরের বাড়ির কাজে হাত লাগান শেখ হাসিনাও
নিজস্ব প্রতিবেদক

খরচ কমাতে ৩২ নম্বরের বাড়ির কাজে হাত লাগান শেখ হাসিনাও

গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার পর বাবা বঙ্গবন্ধুর বারবার কারাগারে যাওয়ায় আর্থিক অনটনে পড়তে হয়েছিল পরিবারটিকে। এর মধ্যে বাড়ি ভাড়া পেতেও হয় সমস্যা। আর রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার সময় বিমা কোম্পানির বেতনের টাকার সঙ্গে বাড়ি থেকে পাঠানো টাকায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি করা হয়েছিল।

এই বাড়ির জমিটি বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেম ৫০ এর দশকে মন্ত্রী থাকা অবস্থায়। তবে সে সময় এলাকাটি এখনকার মতো রমরমা ছিল না। বাড়ি তোলার সময় বাড়ির সামনের ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এমনকি মিরপুর রোড ছিল কাঁচা রাস্তা।

বঙ্গমাতার ৮৮ তম জন্মদিনে বুধবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বক্তব্য রাখতে গিয়ে দেশ ও সংসারের জন্য তার মায়ের যত সংগ্রাম ও চেষ্টার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বাড়ি তৈরির কাহিনিও তুলে ধরেন তিনি।

শেখ হাসিনা জানান, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হয়ে পরে রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় মুক্তি পাওয়ার পর আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি পান। তখন ঢাকায় থাকার অবস্থান কথা চিন্তা করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বরাদ্দ পাওয়া প্লটে বাড়ি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন তার মা। প্রথমে দুটো কামরা করেই তাতে উঠেন তারা।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলন, ‘লেবার (শ্রমিক) খরচ কমানোর জন্য আম্মা নিজের হাতে আমাদেরকে সাথে নিয়ে ইট ভেজানো থেকে শুরু করে ওয়ালে পানি দেয়া থেকে শুরু করে নিজের হাতেই করতেন। একটা একটা করে কামরা ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে ওই বাসাটা।’

‘নিচের তলায় গেলেই বুঝবেন, একটা ফ্লোর উঁচু, একটা নিচু, এটা সে কারণেই।’

সে সময় ওই এলাকাটি কেমন ছিল, সেটিও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘রাস্তাঘাটও তৈরি হয়নি সে সময়, মিরপুর রোড কাঁচা। মাটির রাস্তা, খোয়া বিছানো। ৩২ নম্বরের রাস্তা তো একেবারেই কাঁচা রাস্তা ছিল। বাস সার্ভিস ছিল না। কোনো রকমে রিকশা চলত।’

‘ওই অবস্থায় মা এখান উঠলেন, বললেন, কেউ বাড়ি দেয় না। আমরা সেখানে উঠলাম ৬১ সালের ১ অক্টোবর।’

৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের হয়ে বঙ্গবন্ধুর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং পরে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার পর গোপালগঞ্জে দাদার বাড়ি থেকে ঢাকায় আসেন শেখ হাসিনা। কিন্তু শহরে এসেই বাবাকে গ্রেপ্তার হতে দেখেন তিনি। আর শহর চেনা না থাকা অবস্থায় বাড়ি ভাড়া পাওয়া নিয়ে দুর্গতির কথা তুলে ধরেন তিনি।

‘১৯৫৪ সালে আব্বা যখন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, তখন আমাদেরকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। আব্বা মিনিস্টার হলেন, মিন্টো রোডের বাসায় আমরা। কিন্তু সেই সরকার বেশিদিন টিকতে পারেনি। পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার সব সময় একটা চক্রান্তে লিপ্ত ছিল… কিছুদিনের মধ্যে ইমার্জেন্সি ডিক্লায়ার হলো এবং মন্ত্রিত্ব চলে গেল, আমার আব্বাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হলো।’

‘মাত্র ১৪ দিনের নোটিশ দেয়া হলো বাড়ি থেকে উঠে যেতে। মা কেবল ঢাকায় এসেছেন। কতটুকুই বা চেনেন। কে বাড়ি দেবে? তখন আওয়ামী লীগের সকল নেতা কর্মী প্রায় বন্দী।’

‘এই অবস্থায় আমাদের কিছু শুভানুধ্যায়ী, আওয়ামী লীগের সমর্থক, তারা মায়ের জন্য নাজিরাবাজারের একটা গলিতে একটা বাসা ঠিক করে দিলেন। আম্মা সেখানে গিয়েই উঠলেন। কারণ, আব্বাকে জেলে রেখে আর গ্রামে ফিরে যেতে চাইলেন না।’

বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান ১৯৫৫ সালে। ওই বছরেই জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচন করে জয়ী হন। পরের বছর আবার মন্ত্রী হন। ফলে আবার আসেন সরকারি বাড়িতে। কিন্তু ১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে গেলে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক হন।

এ সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধুকে ‘টি বোর্ডের’ চেয়ারম্যান করলেন। দেয়া হয় একটি সরকারি বাড়ি ও একটি গাড়ি। কিন্তু ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারির পর ১২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।

‘নোটিশ দেয়া হলো তিন দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়তে হবে। এই তিন দিনের মধ্যে কে আমাদেরকে বাড়ি ভাড়া দেবে? আমার দাদি তখন বাসায়’- দুর্দশার কথা বলেন শেখ হাসিনা।

‘আমার মনে আছে, আমাদের বাড়ি সার্চ করতে আসল। আমি তখন পুতুল খেলি, পুতুলের খাপ থেকে সব কিছু ছুড়ে ফেলে দেয়া হলো। একটা জিপ ছিল সেটা নিয়ে গেল, একটা টেপ রেকর্ডার ছিল, সেটাও নিয়ে গেল। কিছু নগদ টাকা ছিল, আমার মার আলমারি টালমারি সব খুলে সার্চ করল, টাকা পয়সা সবই নিয়ে গেল। নিয়ে তিন দিনের নোটিশ দিল, আমার আম্মা তখন মালপত্রসহ রাস্তার ওপর দাঁড়ানো।’

“আমাদের বাসায় কর্তব্যরত দেয়া একজন পুলিশ কর্মকর্তার সিদ্ধেশ্বরীতে একটি বাড়ি কেবল তৈরি হচ্ছিল, দুটো কামরা, রাস্তাঘাট কিছু নেই। উনি বললেন, ‘আমার এই জায়গাটায় থাকতে পারেন’।”

‘ওনার বাড়ি গোপলগঞ্জ ছিল বলেই হয়ত মায়া হলো, তার বাড়িতে আশ্রয় দিল’- বলেন শেখ হাসিনা।

‘ওখানে কয়েক মাস থাকার পর ৭৬ নম্বর সেগুনবাগিচায় ছোট্ট ফ্লাটে বাড়িভাড়া পাওয়া গেল সেখানে উঠলাম।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আব্বা জেলে থাকতে যে কষ্টটা হতো, আমাদেরকে কেউ বাড়ি ভাড়া দিত না। আমার মাকে দেখতাম দিনের পর দিন কষ্ট করে যাচ্ছেন।’

বঙ্গমাতার দাদার বেশ জমিজমা ছিলে। তার একমাত্র সন্তান মারা যাওয়ার পর তিনি তার দুই নাতনির নামে সব লিখে দিয়ে যান। আর সেখান থেকে পাওয়া আয় বঙ্গবন্ধুর বাবা পাঠাতেন তার পুত্রবধূর কাছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দিষ্ট বলতে তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু সহায়তা করতেন দুই হাত খুলে। তাই বঙ্গমাতা পাঠানো সেই টাকা তুলে দিলেন বঙ্গবন্ধুর হাতে।

বঙ্গবন্ধুর মতোই বঙ্গমাতাও মানুষকে সহায়তা করেছেন তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে। এমনকি এ জন্য অলঙ্কারও আসবাবপত্রও বিক্রি করেছেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আব্বা যখন জেলে, হয়ত সংগঠন চলে না, বা কোনো গরিব কর্মীর চিকিৎসা আম্মা নিজের গহনাগুলোও সে সময় বিক্রি করে দিতেন। কিন্তু আমার মা কিন্তু কখনও আমাদের কাছে বা কারও কাছে নিজের দৈন্যতা প্রকাশ করতেন না। বলতেন এগুলো পুরনো হয়ে গেছে, পুরনো ডিজাইন, এরপর ভেঙে নতুন বানাব, দিয়ে দেই।’

‘আব্বা আমেরিকা থেকে ফ্রিজ নিয়ে এসেছিলেন, বলছেন যে এই ঠান্ডা পানি খেলে গলা ব্যাথা হয়, ঠান্ডা পানি খাওয়া যাবে না, অসুখ বিশুখ হয়, ফিজটা বিক্রি করে দেই। বিক্রি করে দিল।’

‘সোফা সেট থেকে শুরু করে ফার্নিচার, বলে সব পুরনো ডিজাইন বিক্রি করে দেই, দিল বিক্রি করে। এভাবে একেকটি জিনিস তিনি যখন বিক্রি করতেন, কোনো দিন তিনি বলতেন না, অভাব অনটন বা টাকা পয়সার জন্য, এই কথা কিন্তু আমার মায়ের মুখে জীবনেও কখনও শুনিনি।’

‘আমি তো বড় মেয়ে। একা মনে হয় বুঝতাম আমার মা কেন করছেন। কিন্তু আমি কখনও আমার মায়ের মুখে দৈন্যতার কথা শুনিনি।’

শেখ হাসিনা জানান, সহায়তা করতে গিয়ে অর্থকষ্টে বাজারও হয়নি মাঝে মধ্যে। বলেন, “তখন চাল-ডাল দিয়ে খিচুড়ি রান্না করে আচার দিয়ে খেতাম। আম্মা বলতেন, ‘শোনো, আজ গরিব খিচুড়ি খাব। রোজ রোজ ভাত খেতে ভালো লাগে নাকি?’।”

‘কিন্তু আমি জানতাম, মা হয়ত বাজার করাতে পারেননি। কারণ, আমাদের বাড়িতে যখন কেউ আসত, আমাদের কোনো নেতা-কর্মী, তখন হাতে যা থাকত, মা দান করে দিতেন।’

‘আমাদের বাসায় লেখাপড়া করার জন্য দূরসম্পর্কের আত্মীয় স্বজন অথবা সকলের জন্য স্থান ছিল। ছোট্ট জায়গায় যাকেই আশ্রয় চাইত, তাকেই তিনি আশ্রয় দিতেন, থাকতে দিতেন।’

তার মায়ের সাধারণ জীবনের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি কিছু চাননি জীবনে। বিলাসিতা করেননি, সাধাসিধা কাপড় পরতেন। নিজে বসে থেকে আব্বার জন্য, দাদা দাদির জন্য খাবার রান্না করতেন। কোনোদিন কোনা অহমিকা ছিল না। দেশ স্বাধীন হয়েছে, এই খুশিটাই সবচেয়ে বড় ছিল।’

‘তিনি নির্যাতিতা বোনেরা পুনর্বাসনের জন্য পুনর্বাসন বোর্ড করেছেন। হাসপাতালে হাসপাতালে গেছেন তাদেরকে দেখতে, নিজের হাতে বিয়ে দিয়েছেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছেন, সমাজে তদের প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে গেছেন।’

‘আব্বা প্রধানমন্ত্রীই থাক, আর জেলেই থাক, আম্মা সব সময় সাধাসিধে জীবনযাপন করেছে।… আব্বা বলেতেন, দেশের মানুষ খেতে পারে না, তাদের সামনে কিসের বিলাসিতা? আমি এই কথাটাই শিখেছি।’

‘বাংলাদেশকে সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, তাহলেই আমার বাব্বা, আমার আম্মার আত্মা শান্তি পাবে’-নিজের রাজনৈতিক জীবনের লক্ষ্য ও প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরে বলেন শেখ হাসিনা।


প্রকাশক/সম্পাদক: আবুল হারিস রিকাবদার
প্রকাশক ও সম্পাদক কর্তৃক প্রথম বাংলাদেশ/শিবপুর, নরসিংদী থেকে প্রকাশিত
ফোনঃ বার্তা-০১৭০০-০০০০০০, বিজ্ঞাপন-০১৯০০-০০০০০০, ই-মেইলঃ prothombangladeshnews@gmail.com